সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

875af991-35d6-4aa5-9bc9-4bb6fe24b4fb_The-LunchBox.jpg

চলচ্চিত্র সমালোচনা দ্য লাঞ্চ বক্স: ভুল ট্রেইনে জেঁকে বসা দুই ঠিক যাত্রীর গল্প

লাঞ্চ বক্সে প্রেমের জন্য অতিরঞ্জিত কোন ব্যাপার নেই। যেটা ফুটে উঠেছে সেটা হল দায়বদ্ধতা। আর এ দায়বদ্ধতা মূলত নির্ভরশীলতা থেকে।

দিন শেষে কেবল অপেক্ষা! এ অপেক্ষা আরেকটি  নতুন দিনের, একটি  নতুন চিঠির কিংবা প্রিয় মানুষের রান্না করা খাবারের ডাব্বার। দু’জন অসম বয়সী মানব-মানবীকে একটি ভুল ট্রেন এক করে দিয়েছে। আর সেই সুত্রেই তরুণী ইলা যত্ন করে দুপুরের খাবার বানিয়ে তাকে রোজ রোজ চিঠি লেখা  সাজান ফার্নান্ডেস নামের সেই  মানুষটির জন্যে। যে মানুষটি বয়সে তার চেয়ে ঢের বড়। ইলার প্রাপ্তি বলতে কেবল ঐ চিঠিখানাই। জীবন পথের সম্পর্কগুলো বোধহয় কোন প্রাপ্তির বিচারে স্থাপিত হয় না , তাই তাদের সম্পর্কও এগুতে থাকে। হিসেব-নিকেশের দেয়াল টপকিয়ে। 

আকারে ছোট কিন্তু গোছালো সেই চিঠিতেই আঁকা হতে থাকে তাদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর জীবনযাপনের সাদা-সিঁদে কথাগুলো। আপাত দৃষ্টিতে এই হল  ঋতেশ বাত্রার দ্যা লাঞ্চ বক্স। ঋতেশের দ্যা লাঞ্চ বক্স কে কেবল এই খাবার আর চিঠি লেনদেনের মাঝে আটকে রাখার কোন সুযোগ নেই। প্রচলিত বলিউড ঘরনার বাহিরে এসে তাই ১ ঘণ্টা চল্লিশ মিনিটের এ সিনেমা হয়ে উঠেছে দু’জন অসম বয়সী মানব-মানবীর সম্পর্ক স্থাপনের অনবদ্য উপাখ্যান।

তবে এটাকে সম্পর্ক স্থাপনের চেয়ে বরং সম্পর্ক প্রতিস্থাপন বলাটাই অধিক যৌক্তিক হবে। কেননা, অফিসের ছা-পোষা কর্মচারী সাজান ফার্নান্ডেসের  আর মধ্যবৃত্ত গৃহিণী ইলার মাঝে পারস্পারিক আকর্ষণ কিংবা সম্পর্কের পেছনের কারণটা মূলত যে একটা গভীর শুন্যস্থান থেকে সেটা সচেতন দর্শকদের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে নি।

বিপত্নীক ফার্নান্ডেসের একাকী জীবন যাপন আর ইলার প্রতি স্বামী রাজীবের সীমাহীন অবহেলা প্রকৃতিতে যে অসীম শুন্যতার সৃষ্টি করেছিল সেটাই যেন পূরণ করে দিয়ে গেলো একটা ভুল ট্রেন। দ্যা লাঞ্চ বক্স ছবিটির পুরো কাহিনীই আবর্তিত হয়েছে মুম্বাই শহরের দুই অসম বয়সী মানব-মানবীর সম্পর্ক স্থাপনকে ঘিরে। তাদের এ সম্পর্ক স্থাপনের পিছনে অসাবধানতা বশত যাদের অবদান তারা হল মুব্বাই শহরের বিখ্যাত ডাব্বাওয়ালা। প্রায় কয়েক লাখ মানুষের কাছে নির্ভুল ঠিকানায় খাবার সরবরাহ করার ব্যাপারে যারা কিংবদন্তিতুল্য।

ব্যতিক্রম কেবল অবসর নিতে বসা অফিসের সিনিয়র হিসাব রক্ষক সাজান ফার্নাণ্ডেসের বেলায়। আর সেই সুযোগটির যথার্থ সদ্ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেন নি পরিচালক ঋতেশ বাত্রা। পুরো ছবিতে কাহিনী এগিয়েছে বেশ ধীর গতিতেই। তবে সেটাকে খুব একটা  ধীর গতির মনে হয় নি  কখনও। এর কারন দু’জনার চিঠি গুলোর সাবলীল ভাষা! সবাইকে আবিষ্ট করে রাখার মত যথেষ্ট উপাদান লক্ষণীয় ছিল সে চিঠিতে।

সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিফোন, ই-মেইলের এ যুগেও চিঠির মাধ্যমে তাদের পরস্পরের জানা-বোঝার ব্যপ্তি এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে তারা সব ছেড়ে নির্দ্বিধায় ভুটানের পথে পা বাড়ানোর সাহস করতে পারে। সাজান ফার্নান্ডেসের পত্নী শোক পুরো কাহিনীর কোথাও তেমন স্পষ্ট হয়ে ওঠে নি। বরং যেটা ছিল সেটা হল এক ধরনের অভাববোধ। আর ইলাও চেয়েছিল একটা আশ্রয় কিংবা মুক্তি। তাই লাঞ্চ বক্সে প্রেমের জন্য অতিরঞ্জিত কোন ব্যাপার নেই। যেটা ফুটে উঠেছে সেটা হল দায়বদ্ধতা। আর এ দায়বদ্ধতা মূলত নির্ভরশীলতা থেকে।

প্রাত্যহিক দিন যাপনে হাপিয়ে ওঠা ইলার প্রতি রাজিবের অবহেলাই তাকে নতুন কোন আশ্রয় খুঁজে নিতে বাধ্য করে তুলেছিল।

লাঞ্চ বক্স
 মধ্যবৃত্ত জীবন থেকে বেড়িয়ে আসতে চায় নি। সে আঁকড়ে ধরে ছিল মধ্যবৃত্ত সমাজ আর সেই সমাজের মানুষগুলোকে। সাজান ফার্নান্ডেস সে জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। সেই প্রতিদিন লোকাল ট্রেনে ঝুলে ঝুলে বাড়ি ফেরা,গলির ধারের দোকান থেকে সস্তা সিগারেট কেনা আর স্বপ্ন দেখে বুঁদ হওয়া।কিন্তু এ জীবনতো আমাদের অধিকাংশের জীবন। তাই গল্পের চরিত্রগুলোর সাথে অনেকেই নিজের একটা ছায়া খুঁজতে চাইবেন।

সিনেমা জুড়ে প্রকট হয়ে উঠেছে মুব্বাইয়ের মত আধুনিক শহরেও আছে নারীদের প্রতি পুরুষদের পুরুষসুলভ মানসিকতা। সেখানে নারীর জীবন কেবল চার দেয়ালে বন্দী। ইলা,ইলার মা কিংবা কখনও পর্দার সামনে না আসা ইলার উপরতলার প্রতিবেশী দেশপান্ডে আন্টি সবাই যেন বদ্ধ জীবনে বন্দী। স্বামী, সন্তান আর রান্না-বান্নার মাঝেই আটকে আছে তাদের পৃথিবী। 

সাজান ফার্নান্ডেসের  ভুমিকায় ইরফান খান ছিলেন অসাধারন। আর ইলা হিসেবে নিরমাত কর অনায়াসেই হয়ে উঠতে পেরেছিলেন সত্যিকারের ইলাদের একজন। সরল রৈখিক বা লিনিয়ার ধারায় প্রবাহমান কাহিনীতে চূড়ান্ত ক্লাইমেক্সের জন্য দর্শককে অপেক্ষা করতে হয়েছে একেবারে সিনেমার শেষ অবধি।

শেষ পর্যন্ত ভুল ট্রেনে চেপে সাজান আর ইলা কি সঠিক গন্তব্যে নিয়ে গেল কিনা সে দ্বন্দের কোন সমাধান হয় নি। তাই তাদের দু’ জনের আর কখনও দেখা হয়েছিল কিনা নাকি একজন আরেকজনকে কেবল খুঁজেই গেছে তাদের প্রাত্যহিক জীবনে তা জানা যায় নি। এই অপূর্ণতাই এ ছবিকে নিয়ে যেতে পারে অনন্য এক উচ্চতায়।

সেই সাথে গতানুগতিক বলিউড ঘরানার বাহিরে এসে ইন্ডিয়ান সিনেমার সত্যিকারের শক্তিও যেন আরেকবার টের পাওয়া গেল হল দ্যা লাঞ্চ বক্সের মধ্য দিয়ে।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

নিরমাত-কর, ইরফান-খান, মুম্বাই, ঋতেশ, সাজান-ফার্নান্ডেস, ইলা, সমালোচনা, বলিউড, সিনেমা, চলচ্চিত্র, দ্য-লাঞ্চ-বক্স