সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

belasheshs-bangla-movie.jpg

বাংলা সিনেমা চলচ্চিত্র ‘বেলাশেষে’ - নারীর জন্য আফিম

সিনেমার একেবারে শেষে দেখা যায় বিশ্বনাথ মজুমদর আরতী দেবীর কাছে ফিরে আসেন। কারন তিনি বলেন সবকাজ তিনি সামলাতে পারলেও বিকেল বেলা চা’টা বানাতে তার আলসেমী লাগে। তিনি আরো মনে করিয়ে দেন আরতী দেবী পঞ্চাশ বছর ধরে তার জুতোটাও খুজে রাখে। আর এই প্রশংসায় আরতী দেবী বিশ্বনাথ মজুমদারকে গ্রহন করে নেন।

ফেসবুক খুললেই চোখে পরে কলকাতার চলচ্চিত্র ‘বেলাশেষে’ নিয়ে অনেকের উচ্ছাস। উচ্ছাস প্রকাশকারীদের মধ্যে অধিকাংশই নারী, বলা ভালো তারা সবাই তরুন প্রজন্মের। ইনবক্সেও অনেকে বললো, “ভাইয়া সিনেমাটা দেখেন, অসাধারণ”। তাই শেষ পর্যন্ত সিনেমাটা দেখলাম। দেখার পরই বুঝলাম, এ হলো নারীর জন্য এক কড়া আফিম, আর এই আফিমেই সবাই বুদ হয়ে আছে।

নন্দিতা রায় ও শিব প্রকাশ মুখার্জির পরিচালিত এই চলচ্চিত্রের নির্মান কৌশল, অভিনয়, সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে আমার তেমন কিছু বলার নেই। সংক্ষেপে এটুকুই বলা যায় তার উপস্থাপনা নান্দনিক। আমার মূল বক্তব্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক যে সুক্ষ্ণভাবে প্রেমের মোড়কে নারীকে সেই গতানুগতিক গন্ডিতে আবন্ধ থাকাকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন তা নিয়ে।

গল্পের শুরুতেই দেখা যায় ৪৯ বছর সংসার করার পর বিশ্বনাথ মজুমদার তার স্ত্রী আরতি দেবীকে ডিভোর্স দেওয়ার ঘোষনা দেন। শুধু তাই না, তিনি আরতী দেবীর নামে প্রচুর সম্পত্তি ও বাড়ি লিখে দেন। কারন তার মনে হয় তাদের মধ্যে কোন প্রেম নেই, যা আছে তা শুধু অভ্যাস। শুরু হয় টানাপোড়েন। বিশ্বনাথের সন্তানেরা তার মায়ের পক্ষ হয়ে বাবার বিরোধীতা করে। বিশ্বনাথের মেয়ে মিলি তাকে বলে - “আমার মা’র তোমাকে পঞ্চাশ বছর সেবা করার প্রাইজ হচ্ছে একটা বাড়ি আর তোমার টাকা?”। এইটুকুতে বেশ একটা নারীবাদী আমেজ পাওয়া যায়। বিদ্রোহেরও আভাস পাই।

তারপরই শুধু হয় আফিমের নেশা। আদালতের পরামর্শে বিশ্বনাথ মজুমদার আর আরতিদেবী পনেরো দিনের জন্য শান্তিনিকেতনের বাড়িতে বেড়াতে যান। সাথে থাকে পুরো পরিবার। বাবা মায়ের ঘরে গোপন ক্যামেরা লাগিয়ে মেয়েরা ও তাদের স্বামীরা দুজনের কথা শোনে। বিশ্বনাথ জানতে চায়, আরতি দেবী তার জন্য যা করে তা কি প্রেম না শুধুই অভ্যাস। আরতী দেবী বলেন সবই অভ্যাস, আর পরিচালক বলেন এই অভ্যাস গুলোই প্রেম। প্রেমের মোড়কে শতশত বছর ধরে নারীর একঘেয়ে কাজকর্মগুলো ঢাকা পড়ে যায়। বিশ্বনাথ মজুমদার চান আরতী দেবীকে সাবলম্বী করতে কারন আরতী দেবী কোনদিন ব্যাংকে যাননি, ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে হয় কিভাবে জানেন না, কয়টা এফডি আছে, ইন্সুরেন্সের প্রিমিয়ামে কতটাকা ভরতে হয় তাও জানেন না। ছবির শেষে দেখানো হয় আরতী দেবী একসময় তা ঠিকই শিখে নেন, তা দেখে নারীরা ভাবে পরিচালক তাদের সক্ষমতা দেখাচ্ছেন। কিন্তু তার আগেই পরিচালক আরতীদেবীকে দিয়ে বলিয়ে নেন “বাইরেটা তুমি দেখবে, ভেতরটা আমি তেমনটাই তো কথা ছিলো”। অর্থ্যাৎ সেই গতানুগতিক চিন্তা নারী যতই ক্ষমতাবান হোক না কেনো সে থাকবে ঘরে, আর এটাই প্রেম।

সিনেমার একেবারে শেষে দেখা যায় বিশ্বনাথ মজুমদর আরতী দেবীর কাছে ফিরে আসেন। কারন তিনি বলেন সবকাজ তিনি সামলাতে পারলেও বিকেল বেলা চা’টা বানাতে তার আলসেমী লাগে। তিনি আরো মনে করিয়ে দেন আরতী দেবী পঞ্চাশ বছর ধরে তার জুতোটাও খুজে রাখে। আর এই প্রশংসায় আরতী দেবী বিশ্বনাথ মজুমদারকে গ্রহন করে নেন।

পুরো চলচ্চিত্রে আমরা আরতী দেবীকে একবারও প্রতিবাদী ভূমিকায় দেখি না। বিশ্বনাথের যা ইচ্ছে আরতী দেবীরও তাই ইচ্ছে। বিশ্বনাথ চাইলে আরতী দেবী ডিভোর্সেও রাজি, বিশ্বনাথ চাওয়াতেই তিনি সাবলম্বী, আবার বিশ্বনাথ ফিরে আসাতেই তিনি সব ভুলে সুখী। আচ্ছা আরতী দেবী যদি এভাবে ডিভোর্সের ঘোষনা দিয়ে আবার ফিরে আসতেন, তাহলে কি বিশ্বনাথ তাকে গ্রহণ করতো? আমাদের সমাজ বাস্তবতায় কি সেই সুযোগ আছে? না, নেই। তাই শেষ বেলায় ’বেলাশেষে’ একটি চটক লাগানো গতানুগতিক সিনেমা। যাতে ঝাঁজ আছে, প্রেম আছে, আবেক আছে কিন্তু নতুনত্ব নেই। শতশত বছর ধরে যে প্রেমের আবেগে নারীর প্রতি বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে ’বেলাশেষে’ সেই প্রেমের আফিমেই তরুন প্রজন্মকে নেশাগ্রস্থ করেছে।



এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

বাংলা, সিনেমা, বেলাশেষে, কলকাতা, চলচ্চিত্র, মূল্যায়ন, পরিবার, পারিবারিক, গল্প, ২০১৫