সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

KRISNOPOKKHO.jpg

সিনেমা রিভিউ নিখাদ ভালোবাসার সিনেমা কৃষ্ণপক্ষ

নিখাদ ভালোবাসার সিনেমা কৃষ্ণপক্ষ। হয়তো আপনি তথাকথিত বাণিজ্যিক সিনেমার মত নাচ গান মারপিট পাবেন না। কিন্তু আপনার মন ভোলানোর জন্য ছবিটি একবারের জন্যে হলেও আপনার প্রিয়জনকে নিয়ে দেখতে যান। নিরাশ হবেন না।

হুমায়ূন আহমেদ, যার নামেই অনেক কিছু। মৃত্যুর পরও তিনি তার ভক্তদের মাঝে বেঁচে আছেন তার অনবদ্য সৃষ্টিগুলো দিয়ে। কৃষ্ণপক্ষ উপন্যাস তার মধ্যেই একটি। সম্প্রতি তার এই জনপ্রিয় উপন্যাস নিয়ে তারই স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন এর পরিচালনায় মুক্তি পেয়েছে কৃষ্ণপক্ষ নামক ছবিটি।

উপন্যাস আর সিনেমা এক জিনিস নয়। উপন্যাস পড়ার সময় সবাই যার যার মনের মত করে একটা জগৎ তৈরি করে, সেখানে উপন্যাস এর চরিত্র গুলোকে নিজের মত করে রূপ দেয়। কৃষ্ণপক্ষ’-তে মুহিব, অরু এবং তাদের কাছের মানুষেরা উপন্যাসে সবাই একরকম কিন্তু সিনেমায় তারা আবারও নতুন হয়ে আসে।

উপন্যাস নিয়ে সিনেমা বানানো সহজ কাজ নয়। আর যেখানে  বাংলাদেশের মানুষ হুমায়ুন আহমেদকে আপন মনে করে, তার সৃষ্টিগুলোকে সবাই নিজের বানানো জগতেই বাস করাতে চায়, সেখানে তার উপন্যাস-গল্প নিয়ে সিনেমা বানাতে হলে আগে নিজেকে অনেক সাহসী হতে হবে।
কারণ তার অনবদ্য সৃষ্টি পাঠকের মনে বসবাস করে, তাই সব সময় ভয় কাজ করে, তার সৃষ্টি দিয়ে সিনেমা নির্মাণ করতে গিয়ে পাঠকের মনের সৃষ্ট চরিত্রকে আবার ভেঙ্গে ফেল্লাম নাতো?

তবে সাহিত্য ও সিনেমার মধ্যে তফাতটা বড়, দুটো এক নয়। আমি হুমায়ূন আহমেদ এর এই জনপ্রিয় উপন্যাস কৃষ্ণপক্ষ পড়িনি। কিন্তু তার ছবি গুলো নিয়ে বরাবরই আমার আগ্রহ ছিল। তাই তার উপন্যাস নিয়ে তৈরি করা ছবি কৃষ্ণপক্ষ আমি দেখা মিস করতে পারিনি।

সিনেমার গল্প অনুযায়ী ‘কৃষ্ণপক্ষ’ কোন আহামরি ও বিস্তৃত গল্প না হলেও ভালো বলা যায়। পুরো সিনেমা কখনো গতি হারায় নাই। 

সিনেমার নায়ক মুহিব একটা হিমু চরিত্র। সেই চরিত্রে রিয়াজ এর অভিনয়  ন্যাচারাল। দুর্ঘটনার পরে আইসিইউতে থাকা অক্সিজেনের নল মুখে রিয়াজের মুমূর্ষু ভঙ্গি দেখে চোখ ছলছল করে এবং এ ধরনের দু’চারটা সিকোয়েন্সই একজন পরিণত অভিনেতার অভিনয়শক্তি বিশ্লেষণের জন্য যথেষ্ট। তবে হ্যা হাব-ভাবে তাঁকে হিমু মনে হয় নি, একমাত্র হলুদ পাঞ্জাবি ছাড়া।

সিনেমার নায়িকা চরিত্রে রূপদান করা মাহিয়া মাহি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় নায়িকা। তাকে নিয়ে ভয় ছিল তিনি  হুমায়ুন আহমেদ এর মত গুণী লেখকের সৃষ্ট চরিত্রে নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন কিনা। কিন্তু কাজটি শাওন আদায় করে নিয়েছে ভালোভাবেই। অরু চরিত্রে মাহির অভিনয়, লুক এবং এক্সপ্রেশন ছিল দুর্দান্ত। শাড়ি পড়া অসম্ভব সুন্দরী লম্বা মুখের ঠোঁটের নিচে তিলওয়ালা কৃষ্ণপক্ষ এর অরু। নিজেকে ভেঙে অভিনয় করাটা মোটেও সহজ ছিলোনা মাহির জন্যে, যা সিনেমা দেখলেই বুঝবেন।

তানিয়া আহমেদ অভিনয় করেছেন জেবা চরিত্রে, তার অভিনয় বরাবরের মত ভালো ছিল। শফিক সাহেব চরিত্রে আজাদ আবুল কালামও অনেক ভাল অভিনয় করেছেন। তাছাড়া ফেরদৌস, মৌটুসী বিশ্বাস,  কায়েস চৌধুরীর অভিনয়ও খারাপ ছিলোনা।

ছবিটি সুন্দর ও নিখুঁত পরিচালনা, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, কোরিওগ্রাফি, সিনেমাটোগ্রাফি, ক্যামেরা শট, ট্রলি ও ক্রেনের ব্যবহার, কালার গ্রেডিং দিয়ে নির্মাণ করা। যা আপনার চোখে পড়বেই। মনেই হবেনা যে এটা মেহের আফরোজ শাওন এর প্রথম পরিচালনায় নির্মাণ করা। 

হুমায়ূন আহমেদ এর গল্প নিয়ে ছবি, তাই বৃষ্টি বিলাশতো থাকবেই, সেটাও আপনি এই ছবিতে পাবেন। ছবির গানগুলোতো ছবি মুক্তির আগেই ইন্টারনেট এর কল্যাণে জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল। সিনেমা দেখতে দেখতে আপনার অজান্তেই আপনার চোখ ভিজে যেতে পারে।

সব থেকে ভালো লেগেছে ছবির এন্ডিং, ছবির ক্লাইম্যাক্সে আপনার জন্য কি অপেক্ষা করছে, তা আপনি কল্পনা করতে পারবেন না। এখানে পরিচালক শাওন বিশাল হল রুমের ভিতরে আলো-ছায়া ও ধোয়াশার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ নিয়ে ইতি দিয়েছেন ছবিটিকে, যা আপনার মন ছুয়ে যাবে।

নিখাদ ভালোবাসার সিনেমা কৃষ্ণপক্ষ। হয়তো আপনি তথাকথিত বাণিজ্যিক সিনেমার মত নাচ গান মারপিট পাবেন না। কিন্তু আপনার মন ভোলানোর জন্য ছবিটি একবারের জন্যে হলেও আপনার প্রিয়জনকে নিয়ে দেখতে যান। নিরাশ হবেন না।
এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

কৃষ্ণপক্ষ, হুমায়ূন-আহমেদ, মেহের-আফরোজ-শাওন, বাংলা-সিনেমা