সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

13117.jpeg

নারীর মুক্তি বেগম রোকেয়া; নারী মুক্তি ও নারী জাগরণের দূত

নারী মুক্তির অগ্রদূত বেগম রোকেয়া। তাঁর গৃহীত পদক্ষেপ বাঙালি নারীকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে।

বিশ শতকের নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২) বাঙালি নারী সমাজকে জাগিয়ে তোলার ব্রত নিয়েই সাহিত্যচর্চায় যুক্ত হয়েছিলেন। প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার ও অচলাবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে তিনি রাজা রামমোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-’৯১) প্রমুখ ব্যক্তির নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।

বাঙালি মুসলমান সমাজ বিশেষ করে নারী সমাজকে তাদের নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন করে তোলা তাঁর সাহিত্যচর্চার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তিনি নারী সমাজের মধ্যে মুক্তির আকাক্সক্ষা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রেরণা সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন। তিনি বাঙালি নারীর মুক্তির পথ নির্দেশ করেন তাঁর সাহিত্যকর্মে।

কালের প্রেক্ষাপটে বেগম রোকেয়া সমকাল পরিসরে এক বিদ্রোহী নারীসত্তা। সে সময় বাঙালি সমাজে নারীদের শিক্ষার সুযোগ ছিল না। ফলে নারী সমাজের মধ্যে নানা ধরনের কুসংস্কার বাসা বেধেছিল। বলাবাহুল্য সেকালে বাঙালি নারীরা একেবারে সমাজ জীবনে নিষ্ক্রিয় ছিল।

বেগম রোকেয়া মনে করতেন, সামাজিক এবং জাতিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষের একক শক্তি যথেষ্ট নয় উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সামাজিক এবং জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব। এজন্য তিনি ঘরের বৃত্তে বন্দী নারীদেরকে সংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে শিক্ষার্জনের মাধ্যমে প্রগতির পথে আহ্বান করেছিলেন। উপরন্তু নারী সমাজের উন্নয়নের জন্যেও তিনি তাদেরকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

নারী সমাজের মুক্তি কামনাই বেগম রোকেয়ার জীবনের ও সাহিত্যচর্চার প্রধান লক্ষ ছিল। নারী সমাজের মুক্তির লক্ষ্যে তাদের শিক্ষিত হওয়া একান্ত জরুরী। শিক্ষাই নারীকে প্রথাগত কুসংস্কার ভেঙে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করতে পারবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। সেকালে নারীশিক্ষার প্রতি পুরুষ কোন পদক্ষেপ নেয় নি; তেমনি নারীরাও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে শিক্ষার পথে এগিয়ে আসেনি।

নারীশিক্ষা তৎকালীন বাঙালি সমাজে শুধুমাত্র ধর্মীয় পুস্তকাদিতে সীমাবদ্ধ ছিল। নারী জাতির এই করুণ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য নারীদের উদাত্ত আহ্বান করেছিলেন মুক্তির পথে। কিন্তু নারী স্বাধীনতা বলতে তিনি নারীর পর্দাপ্রথার বিরোধিতা করেননি, কিংবা বলেননি উশৃঙ্খলতার কথা।

নারী স্বাধীনতা সম্পর্কে তিনি ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন : ‘স্বাধীনতা অর্থে পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থা বুঝিতে হইবে।’ একথাও সত্য যে, স্বাধীনতার প্রথম এবং অন্যতম শর্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক মুক্তি বা স্বাবলম্বন। যে সমাজে স্ত্রীরা অর্থনৈতিকভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল সেখানে নারী স্বাধীনতা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাই রোকেয়ার মতে আত্মনির্ভরতার পথেই নারী জাতির প্রকৃত মুক্তি বা প্রগতি সম্ভব। তাঁর ভাষায় : ‘পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তাহাই করিব।’

বাঙালি নারী সমাজের এই স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য তাদের সর্বাগ্রে দরকার শিক্ষার্জনের সুযোগ। এখন আমাদের জানা দরকার যে, স্ত্রীশিক্ষা বলতে বেগম রোকেয়া কি বুঝিয়েছেন। রোকেয়ার মতে, শিক্ষা অর্থে কোনো সম্প্রদায় বা জাতি বিশেষের অন্ধ অনুকরণ নয়, মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান বা ক্ষমতাকে অনুশীলন দ্বারা বৃদ্ধি করাই শিক্ষা, আর স্ত্রী শিক্ষা বলতে তিনি এমন শিক্ষার কথাই বুঝিয়েছিলেন বঙালি নারী জাতিকে।

স্ত্রীশিক্ষা বলতে তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলেছেন যা নারীর মধ্যে তাদের নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বোধ জাগ্রত করবে; স্বাধীনতার প্রেরণা জোগাবে। তাই বেগম রোকেয়া স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন : ‘শিক্ষা অর্থে আমি প্রকৃত সুশিক্ষার কথাই বলি; গোটা কতক পুস্তক পাঠ করিতে বা দু’ছত্র কবিতা লিখতে পারা শিক্ষা নয়। আমি চাই সেই শিক্ষা- যাহা তাহাদিগকে নাগরিক অধিকার লাভে ক্ষম করিবে। শিক্ষা- এবং শারীরিক উভয়বিধ হওয়া চাই।’

বেগম রোকেয়া প্রত্যাশিত এই স্ত্রীশিক্ষার প্রধান অন্তরায় হিসেবে ধর্মকে চিহ্নিত করেছেন। সমাজপতিগণ ধর্মের নামে এ দেশের নারী সমাজকে কিভাবে অন্ধকারে রেখেছে সে বিষয়ে তিনি তাঁর মন্তব্য জোরালো কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন। ধর্ম সম্পর্কে যে কথা  বিশ শতকের শুরুতেই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলেন একমাত্র তিনিই বলতে পেরেছেন : ‘আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশ পত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়ছে ... ধর্মের দোহাই দিয়ে পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভূত করিতেছেন।’

বেগম রোকেয়া মনে করেন, বাংলার নারী সমাজকে ধর্মের নাম করে পর্দায় আবৃত করে অবরোধ করে রাখা হয়েছে। আমাদের দেশে যে অর্থে পর্দাপ্রথা প্রচলিত তিনি তার সমর্থক নন। কারণ, এখানে পর্দার অর্থ যতটা না নৈতিক তার থেকে বেশি বন্দীত্ব। তাঁর মতে পর্দাপ্রথা  অবশ্যই গ্রহণযোগ্য, কিন্তু বন্দীত্ব মোটেই নয়।

‘বোরকা’
প্রবন্ধে তিনি পর্দার বিরোধিতা করেন নি, কারণ পর্দার সাথে উন্নতির বেশি বিরোধিতা নেই। উন্নতির জন্য প্রয়োজন উচ্চশিক্ষা। পর্দার নামে অবরোধ প্রথা মূলত নৈতিকতার অবরোধ বলেই তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষায় : ‘আমরা অন্যায় পর্দা ছাড়িয়া আবশ্যকীয় পর্দা রাখিব।’ তিনি মেয়েদের জন্য স্বতন্ত্র স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠার সমর্থনে বক্তব্য রেখেছেন।

অর্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া নারীর প্রকৃত অবস্থার উন্নতির জন্য তার মানসিক দাসত্ব মুক্তির ওপর জোর দিয়েছেন। যে সমাজে স্ত্রীলোক তার আপন ইচ্ছা শক্তি প্রয়োগের অধিকারী নয়, পর্দাপ্রথা থাক বা নাই থাক- নারী সেখানে আসলে পুরুষেরই অধীন। এ প্রসঙ্গে তিনি পার্সি মহিলাদের পরিবর্তিত অবস্থার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন : ‘এখন পার্সী মহিলাদের পর্দামোচন হইয়াছে সত্য, কিন্তু মানসিক দাসত্বমোচন হইয়াছে কি? অবশ্যই হয় নাই।’ অতএব রোকেয়া এখানে নারীর মুক্তির জন্য মানসিক মুক্তিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

‘স্ত্রী জাতির অবনতি’
প্রবন্ধেও সমাজচিন্তা প্রসঙ্গে বিশেষ কিছু দিক তুলে ধরেছেন। যেমন স্ত্রীগণ তাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যেসব অলংকার ব্যবহার করেন বেগম রোকেয়া সেগুলোকে ‘দাসত্বের নিদর্শন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি কারাগারের বন্দীদের সাথে নারীর অলংকার পরিধানের তুলনা করেছেন। এমনকি অলংকারের মাধ্যমে শ্রীবৃদ্ধি করাকেও তিনি নারীর মানসিক দুর্বলতা ভেবেছেন।

আর নারীর এই মানসিক দুর্বলতার জন্য তিনি সংসারে পুরুষের মুখাপেক্ষী হওয়ার কথা বলেছেন। এ প্রবন্ধে তিনি আপন উন্নতির জন্য নারী সমাজকে নির্ভরশীলতার পথে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘বিবেক আমাদিগকে আমাদের প্রকৃত অবনতি দেখাইয়া দিতেছে- এখন উন্নতির চেষ্টা করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।’

বেগম রোকেয়া বাঙালি নারী সমাজের প্রতি সুপ্তির ঘোর কাটিয়ে আপন পায়ে দাঁড়াবার আহ্বান জানিয়েছেন ‘সুবেহ সাদেক’ প্রবন্ধেও। তিনি বলেছেন : ‘ভগিনীগণ! চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন- অগ্রসর হউন, বুক ঠুকিয়া বল বল কনে! আমরা জড়াউ অলংকার রূপে লোহার সিন্ধুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নাই; সকলে সমস্বরে বল আমরা মানুষ। আর কার্যতঃ দেখাও যে আমরা সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ অংশের অর্ধেক।’

বেগম রোকেয়া নারীমুক্তি ও জাগরণের যে স্বপ্ন দেখতেন, সাহিত্যজীবনের গোঁড়াতে সে স্বপ্ন তিনি কল্পনায় রূপায়িত করেছেন তাঁর 'Sulatana's Dream' রচনায়। এ রচনায় মূলত পুরুষশাসিত সমাজে নারীর ওপর সমাজ তথা পুরুষের নিপীড়ণের প্রতিবাদ বা প্রতিশোধ হিসেবে এবং নারীকে তার অপরিসীম ক্ষমতায় বিশ্বাস জন্মানোর জন্য তিনি একটি মডেল সমাজের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন।

‘নারীস্থান’
নামে নারীশাসিত যে স্বপ্নরাজ্যের ছবি বেগম রোকেয়া এঁকেছেন তা সবদিক থেকেই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার, সেখানে কখনো মহামারী হয় না, মশার কামড় নেই, অকাল মৃত্যু হয় না বললেই চলে; এবং পুরুষজাতি শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকায় চুরি, ডাকাতি, হত্যাকা- ইত্যাদি হয় না; অতএব পুলিশ প্রশাসনেরও দরকার হয় না সে সমাজে। ‘স্বয়ং পূণ্য’ সেখানে নারীবেশে উপস্থিত। এক কথায় তিনি নারী নেতৃত্বে বিজ্ঞান সম্মত উন্নত সমাজ জীবনের কল্পনা করেছিলেন।

বেগম রোকেয়ার সাহিত্যচিন্তার কেন্দ্র নারী, নারীমুক্তি, নারীর উজ্জীবন এবং সমাজ জীবনে পুরুষের সমান নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আর এর জন্য তিনি তথাকথিত পর্দার আবরণ ভেদ করে হলেও নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সংসারে সন্তানের সুষ্ঠুভাবে বিকাশ থেকে আরম্ভ করে নিজেকে সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

বেগম-রোকেয়া, নারী-জাগরণ, নারী-মুক্তি, নারী-শিক্ষা, আন্দোলন, সাহস, অধিকার