সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

kazi-nazrul-islam-bidrohi-kobi.jpg

মুক্তিযোদ্ধা কবি বিদ্রোহের জলন্ত প্রতীক কাজী নজরুল ইসলাম

কবি সমাজ বিনির্মানের শুধু কারিগরই ছিলেন না, তিনি আশা জাগিয়েছিলেন, স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, ভালবাসার রঙধনু নিয়ে প্রেম নিবেদনে এগিয়ে গিয়েছিলেন মধু চন্দ্রিমার ছন্দ এঁকে এঁকে।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের কবি মনের আবেগের অনেকটা জায়গা দখল করে বসে আছেন। তাঁর জীবনটা ছিল সংগ্রামের। তিনি তাঁর জীবনটাই শুরু করেছিলেন প্রায় অভিভাবকহীন অবস্থায়, ফলে তাঁর জীবনের গতি পথটা মসৃণ ও নির্বিবাদ ছিল না। অথচ তাঁর হৃদয় টা ছিল এতই বড় যে, সেই মাপের হৃদয়কে ধারণ করার মত সামাজিক পরিবেশ ছিল তখন একেবারেই অনুপস্থিত। যে কারণে তাঁর মন-মেজাজ, আচার-আচরণ নিয়ে  অনেকের মাঝেই এক ধরণের উষ্মা ছিল।

এ রকমই একটা ঘটনা ঘটেছিল ভারত বিভক্তির পর। তখন কবি ভীষণ অসুস্থ, তৎকালীন ভারত সরকার কবির সুচিকিৎসার ব্যাপারে ছিল দারুন উদাসীন । নিরুপায় কবি'র বড় ছেলে এসেছিলেন বাংলাদেশে ( তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে )। তিনি ময়মনসিংহ সহ কয়েক স্থানের অনেককেই অনুরোধ করেছিলেন কবিকে এ দেশে নিয়ে আসার জন্য, কিন্তু দুঃখের বিষয় তাঁর ধর্মীয় পরিচয় কে তখন প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল। তাদের বা তাদের মত সবাই কে আমি কবির ধর্মীয় পরিচয় পাবার জন্য তাঁর রচিত 'এক আল্লাহ্ জিন্দাবাদ' কবিতাটি পড়ার জন্য বিনীত ভাবে অনুরোধ করব।

তাঁর রচিত 'উমর ফারুক' কবিতাটি এর পূর্বেও পড়েছিলাম, আজ আবারও পড়লাম, শব্দ করে পড়তে গেলে কন্ঠ ধরে আসে, মনে মনে পড়তে গেলেও আবেগ জড়িয়ে ধরে। কাজী নজরুল ইসলাম যে ভাবে হযরত উমর (রা:) এর শাসক জীবনের খন্ডাংশ তাঁর এ কবিতায় তুলে ধরেছেন, আমার জানা নেই,  তাঁকে কেউ কখনও কল্প কাহিনী বলে উড়িয়ে দিয়েছেন কিনা!

কবি এ কবিতার মাধ্যমে হযরত উমর (রাঃ) এর ব্যক্তি জীবন কে চিত্রায়িত না করে শাসক জীবনকেই সবার সামনে তুলে ধরেছেন। আর এই কবিতা পড়ার পর আমার বিশ্বাস, সবারই  মনে হবে পৃথিবীতে এমন সুন্দর শাসন ব্যবস্থা এবং জনদরদী, ন্যায়ানুগ এমন শাসক আর হয়তো আসবে না। আর কবিতাটাও যে রকম সহজ সরল নির্মল ভাব ও ভাষায়, ছন্দে ছন্দে রচনা করেছেন,  তাতে আমরা যারা কবিতা লেখার চেষ্টা করি তাদের সকলেরই উচিৎ কবিতাটা পড়ে সেখান থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করা। আমার মনে হয় সার্বিক বিচারে এর চেয়ে ভাল কবিতা হতেই পারে না। তাই সকলের প্রতি কবিতাটা পড়ার জন্য অনুরোধ রইল।

তিনি  ছিলেন সুদুর প্রসারী  চিন্তার অধিকারী এবং অত্যাচারী শাসক-শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যেমন খড়গ হস্ত তেমনি আন্তর্জাতিক আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে শুধু সন্মুখ যোদ্ধাই নয়, জাতীয়তাবাদী কলমযোদ্ধাও। তাইতো বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখা 'কান্ডারী হুশিয়ার!' কবিতার নিম্নোল্লিখিত তিনটি লাইন যেমন - 

'কান্ডারী! তব সন্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়,ভারতের দিবাকর!'

লাইন তিনটি বাদ দিয়ে  কবিতাটি  ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য হুবহু প্রনিধানযোগ্য ও দীপ্যমান। কবির কবিতাগুলো কালজয়ী হয়ে এখন ও আমাদের মাঝে উদ্ভাসিত।

কবি সমাজ বিনির্মানের শুধু কারিগরই ছিলেন না, তিনি আশা জাগিয়েছিলেন, স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, ভালবাসার রঙধনু নিয়ে প্রেম নিবেদনে এগিয়ে গিয়েছিলেন মধু চন্দ্রিমার ছন্দ এঁকে এঁকে। রুদ্র সংকটেও তিনিই তো সমাজ স্থপতির মত গন্তব্যের নকশা এঁকে এঁকে পথের দিশা জানিয়েছিলেন, বর্গীদের সামনে বুক চিতিয়ে প্রতিরোধের ভাষায় আগুন ঝরা বারুদের মত কবিতার স্ফুলিঙ্গ হেনেছিলেন, 'ঝাঁকরা চুলের বাবরী দোলানো সাহসী যুবকের মত'! তিনিই তো যোদ্ধা, তিনিই তো কবি। 

পেছনে ফেলে আসা মুক্তিযুদ্ধের কবিতা লেখা আর মুক্তিযুদ্ধের উত্তাপে নিজেকে ঝলসানোর স্বাদ অনন্যতর ভিন্নতার দাবী নিয়ে আজও তিনি আমাদের মাঝে উচ্চশির। বিদগ্ধ মুক্তিসেনা তো তিনিই, যিনি অবলীলায় বলতে পারেন, 'জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি'। তিনি আপোষকামী, তোষামোদকারীদের মত সুবিধা খরিদের নব্য বণিক ছিলেন না। কবি ছিলেন আপোষহীন শুদ্ধি অভিযানের অগ্রনায়ক, তিনি অশুদ্ধ কড়ি কুড়ানো কিংবা কাগজের জমিনে আত্মম্ভরিতা প্রকাশের শৃগাল শাবক ছিলেন না। সেই মুক্তিযোদ্ধা কবির উত্তরসুরীরাও আজ কবিতা বানিজ্যের বিণিময়ে আপন স্বার্থের রক্ষিতা না হয়ে সকল প্রতিকুলতা সগৌরবে জয় করবেন।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Kazi-Nazrul-Islam, Nazrul, Islam, Poet, bangla, Bidrohi, Nationalist, pride, Personality