সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

shab-e-barat.jpg

শবে বরাতে বিদাতমুক্ত থেকে ইবাদাত বন্দেগী করতে হবে

অথচ প্রতি বছর আমাদের দেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভির্যের পাশাপাশি বিদাতযুক্তভাবে পালিত হয় শবে বরাত। চারিদিকে থাকে উৎসবের আমেজ। থাকে সরকারী ছুটি। হালুয়া-রুটি, ভাল ভাল খাবারের ধুম পড়ে যায়।

লাইলাতুল বারা’আত- নাজাতের রাত। ‘লাইলাতুন’ বা ‘শব’ অর্থ রাত। আর ‘বারা’আতুন’ অর্থ ‘নাজাত’ - নিস্কৃতি। যেহেতু এ রজনীতে বিশ্ব জাহানের মালিক আল্লাহর গোলামেরা তওবা ও ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে জাহান্নআম থেকে নাজাত ও নিস্কৃতি পেয়ে থাকে, তাই এ রাতের নাম ‘লাইলাতুল বারা’আত’ বা ‘শবে বরাত’। শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত, অর্থাৎ ১৫ শাবানের পূর্বের রাত হচ্ছে শবে বরাতের রাত।

পবিত্র রমজানের বার্তাবহ এবং পূর্ববর্তী নিকটতম মাস হিসাবে এ মাসের গূরুত্ব ও ফজিলত অনেক। মানুষ অভ্যাসের দাস। আগে ভাগে নেক আমলের অভ্যাস না করলে হঠাৎ কোন বড় ধরনের সাধনা বা পরীক্ষার সম্মূখীন হলে তাতে অকৃতকার্য হবার সম্ভাবনা থাকে বেশি। কাজেই শাবান মাসের নামাজ, রোজা, কুরআন তেলাওয়াত ও ধ্যান-ধারণা রমজান মাসের উপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে এটাই স্বাভাবিক। তাই বলা হয়ে থাকে রজব মাসে চাষাবাদ করে ইবাদাতের বীজ বপন কর, শা’বান মাসে তাতে পানি দাও এবং রমজানে ফসল কাট।

অথচ প্রতি বছর আমাদের দেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভির্যের পাশাপাশি বিদাতযুক্তভাবে পালিত হয় শবে বরাত। চারিদিকে থাকে উৎসবের আমেজ। থাকে সরকারী ছুটি। হালুয়া-রুটি, ভাল ভাল খাবারের ধুম পড়ে যায়। শুরু হয় মিলাদ, ওয়াজ, জিকির ইত্যাদির মজলিস, টিভিতে আলোচনা অনুষ্ঠান। সেই সাথে পুলিশ প্রশাসনের নিষেধ থাকা স্বত্তেও মুহুর্মুহু আতশবাজিতে কেঁপে উঠে রাতের আকাশ। দেখা যায় সারা বছর মসজিদে যাদের পদযুগল পড়েনি, সে রাতে তারাই গোসল করে, টুপি-পাজমা-পাঞ্জাবী পড়ে, আতর-সুগন্ধি মেখে, পরিপাটি হয়ে মসজিদের প্রথম কাতারে বুক ফুলিয়ে মুসল্লী বেশে অবস্থান করছে। সাথে সাথে নিজেদের উদ্ভাবিত প্রচলিত বিশেষ কিছু আনুষ্ঠানিকতাকে এবাদত-বন্দেগী মনে করে সম্পাদন করবে এবং ভাববে জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে গেছে। পর দিন সকাল থেকে আবার লিপ্ত হবে পূর্বের ন্যায় আল্লাহর নাফরমানীতে, তাগুতের পথে। আর অপেক্ষায় থাকবে আগামী বছর শবে বরাতের।

কবি এসএম খায়রুল বাসারের ভাষায়:

সারা বছর পাইনি সময়, নানান কাজের ভারে
স্মরণে তাই আসেনি প্রভূ, যে সৃজিল মোরে।
বছর ঘুরে বরাত রাতে, সম্বিত ফিরে এলে
আতর মেখে, খুশবু মেখে -
ফুলবাবু তাই এল রবের ঘরে।

তবে রাত পোহালো যবে,
রবকে ভুলে পুন:শ্চ সে আপন পথে চলে।

এভাবে চলে আসছে বছরের পর বছর। আমরা জানার কখনও জানার চেষ্টা করি না এ কাজগুলো কতটুকু শরিয়ত সম্মত, ইসলাম সম্মত?

তবে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিনের কাছ থেকে রহমত, বরকত, সওয়াব তথা সফলতা পেতে হলে আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু বিদাত অবশ্যই বর্জন করতে হবে, যা শরিয়ত সম্মত নয়। আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে যে আমাদের রসুল (স:) দ্বীনকে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন না করে রেখে যাননি। আর আল্লাহ তাআলা ইসলাম কে মানবজাতির জন্য পূর্নাঙ্গ বিধান হিসেবে দিয়েছেন, এতে কোন কিছু বাকি রাখেননি বা কোন নতুন কিছুর সূচনা করার অবকাশ দেননি। তিনি কুরআনে বলেছেন, 'আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।' (মায়েদা: ৩)। 

রসুল (স:) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি দ্বীনে এমন কিছু শুরু করল যা আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে তা প্রত্যখ্যাত হবে।' (বুখারি ও মুসলিম)। তিনি আরো বলেন, 'সর্বাপেক্ষা উত্তম বাণী হল আল্লাহর, সর্বাপেক্ষা উত্তম পথনির্দেশ হল তাঁর রসুলের আর সর্বাপেক্ষা খারাপ কাজ হল নব উদ্ভাবিত বিষয় গুলো (বিদাত); সকল বিদাত ই পথভ্রষ্টতা।' (মুসলিম) এবং'সকল ভ্রষ্টতা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।' (আন নাসাঈ)।

এ বছর ২ জুন দিবাগত রাত শবে বরাত। তাই বিদাত থেকে বেচে থাকার জন্য আমাদের সমাজে শবে বরাতে যেসব বিদাত বা কুসংস্কার প্রচালিত আছে সে সম্মন্ধে নীচে আলোকপাত করা হবে। অবশ্য দেশের সব এলাকায় বিদাতগুলোর সবই একসাথে দৃশ্যমান হবে তা নয়।

১.
শবে বরাত উপলক্ষে বহুল প্রচলিত বিদাত বা কুসংস্কার হল হালুয়া-রুটির প্রচলন। শবে বরাত উপলক্ষ্যে ঘরে ঘরে হালুয়া-রুটি খাওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। বর্তমানে এর সাথে যোগ হয়েছে পোলাও–কোরমাসহ অন্যান্য রিচ ফুড। শুধু তাই নয় বরং সেদিন গরীব মানুষও টাকা ধার করে হলেও এক বেলা মাংস কিনে খায়। কারণ, সে দিন যদি ভাল খাবার খাওয়া যায় তাহলে নাকি সারা বছর ভাল খাবার খাওয়া যাবে। হালুয়া-রুটি, ভাল ভাল খাবার তৈরী করা, খাওয়া এবং অন্যকে খাওয়ানো বা দেওয়া ভাল, দোষের কিছু নয়। কিন্তু শুধু এদিনেই কেন? অন্যদিনে নয় কেন? আর হালুয়া রুটির সাথে শবে বরাতের সম্পর্কই বা কি? হালুয়া-রুটি খাওয়ার ব্যাপারে সমাজে দুটি ধারনা চালু আছে। প্রথমত: হালুয়া-রুটি খাওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়, নবী (স:) ওহুদ যুদ্ধে দাঁত ভাঙ্গার পর শক্ত খাবার খেতে পারেননি। তাই তাঁর প্রতি সমবেদনা জানানোর উদ্দেশ্যে এ দিন ঘটা করে হালুয়া রুটি খাওয়া হয়। কাফেরদের সাথে এক কঠিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বীরের মত যুদ্ধ করে মহানবী (স:) এর দন্ত মুবারক শহিদ হয়েছিল। কিন্তু আমাদের এসব নবী ভক্তের অধিকাংশ জানেই না যে, শবে বরাত আর ওহুদ যুদ্ধ এক দিন শুধু নয় একই মাসে পর্যন্ত সংগঠিত হয়নি। ওহুদ যুদ্ধ হয়েছিল শাওয়াল মাসে আর শবে বরাত হয় শাবান মাসে। তাছাড়া এসব নবী ভক্তের অধিকাংশের অবস্থা হল, তারা আল্লাহর নবীর রেখে যাওয়া সাধারণ সুন্নতগুলোও পালন করে না। অনেকে তো ফরজ নামাযই ঠিকমত আদায় করে না। আর হালুয়া খাওয়ার আগে ইসলামের জন্য দাঁত হারানো তো দূরের কথা, হাড় খাওয়া ছাড়া দাঁতে আঘাত লাগতেও তো দেখা যায় না। হালুয়া-রুটি খাওয়ায় হল নবী প্রেমের নুমনা!

হালুয়া রুটি বিদাত বললে, অনেকে বলে থাকেন এগুলো গরীবদের বঞ্চিত করার মাসআলা। কিন্তু এই একদিন বাদে বাকি ৩৬৪ দিন হালুয়া-রুটি, পোলাও-মাংস বিতরন করলে, দান ছদকা করলে সওয়াব কি কম হবে? ভাল ভাল রান্না করা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যখন ব্যস্ত থাকবে, তখন ইবাদতের ক্ষতি হবে, সময় নষ্ট হবে। তাই এসব ঝামেলা বাদ দিয়ে প্রয়োজনমাফিক পরিমিত আহার করে ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকাই হেদায়েত প্রাপ্তদের কাজ হবে এটা বলা যায়।

২.
প্রচলিত কুসংস্কারের আর একটি হল আতশবাজী বা পটকা ফোটানো। এ রাতে আশ্চর্যজনকভাবে চলতে থাকে আতশবাজী বা পটকা ফোটানো। এটা এত খারাপ কাজ, যাতে ইহকালেও কল্যাণ নেই, পরকালেও কল্যাণ নেই। আছে শুধু বাড়াবাড়ি, অপচয়, অপব্যয় আর পাপ। এসব কাজ অগ্নিপুজকদের সাথে শুধু সাদৃশ্যপূর্ণই নয়, বরং রীতিমত বিধর্মী অগ্নিপূজকদের অনুসরণ, অনুকরণও বটে। মহানবী(স:) বলেছেন, 'যে যার অনুকরণ করে, সে তারই দলভূক্ত।' ইয়াজুয-মাজুয আল্লাহর উদ্দেশ্যে তীর নিক্ষেপ করবে। আমাদের কিশোররা যুবকরা বুঝে হোক না বুঝে হোক আতশবাজীর মাধ্যমে তাদের অনুকরণ করছে। এ বরকতময় রাতে আল্লাহ এবং তার ফেরেশতাগণ দুনিয়াবাসীর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন।বান্দাদেরকে রহমত গ্রহনের জন্য অবিরত আহবান করতে থাকেন। আর আমাদের সন্তানেরা আল্লাহর তাজাল্লী, নূর ও রহমতের অংশ নেয়ার পরিবর্তে আতশবাজী দ্বারা তার প্রতি উপহাস ও বিদ্রুপ প্রদর্শন করে। এ অবস্থা কি আদৌ যৌক্তিক?

৩.
এ উপলক্ষ্যে ঘর-বাড়ি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে আতর সুগন্ধি লাগিয়ে পরিপাটি করে রাখার প্রথাও চালু আছে। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ এবং তা অবশ্য প্রতি দিনের জন্যই উত্তম। কিন্তু এদিনে এটাকে আবশ্যকীয় মনে করে অন্যদিন অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন থাকাই যত বিপত্তি। এসব কুসংস্কার ভিত্তিহীন ও অমার্জনীয়। এমনকি অনেকে এ রাতে কিছু খাবার একটুকরো কাপড়ে পুরে ঘরে ঝুলিয়ে রাখে, অনেকে জানালা দিয়ে বা উঠানে প্লেট ধোয়া পানিও ফেলে না এ বিশ্বাসে যে, মৃত স্বজনদের আত্মা এ রাতে নিজ নিজ পরিবারের সাথে দেখা করতে আসে, ছওয়াব নিতে আসে। এটা যে কত বড় মূর্খতা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হাদিসের কোথাও বলা হয়নি এ রাতে মৃত ব্যক্তিদের আত্না নিজ গৃহে ফিরে আসে। মানুষ মারা গেলে তাদের আত্মা বছরের কোন একটি সময় আবার দুনিয়াতে ফিরে আসা মুসলমানদের আকীদাহ নয়। বরং অনেকটা তা মূর্তিপূজকদের আকীদার সাথে সাঞ্জস্যপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ বানোয়াট একটি কথা।

৪.
উল্লেখযোগ্য একটি বিদাত হল কবরস্থানে বা গোরস্থানে বাতি জ্বালানো, কবর জিয়ারত ও ফকিরদের মেলা করা। এক শ্রেণীর মানুষ এ রাতে মাযার জিয়ারতে বের হয়। কোথাও কোথাও এমনও দেখা যায় যে, কিছু মানুষ দলবদ্ধ হয়ে এ রাতে ধারাবাহিকভাবে এলাকার সকল কবর জিয়ারত করে থাকে। কবর জিয়ারত করা ভাল, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে বিশেষ কোন রাতকে উপলক্ষ্য করে কবর জিয়ারতের প্রচলন করা মোটেই শরিয়তশুদ্ধ নয়। আর গোরস্থানে বাতি জ্বালানো, ফকিরদের মেলা করানো কোন সময়ের জন্য জায়েজ নয়।

৫.
শবে বরাত উপলক্ষ্যে মসজিদ, খানকা ও দরগা সমূহে মিলাদের ব্যবস্থা এখনও বহাল তবিয়তে চালু আছে। সাথে সাথে চালু আছে চাঁদা তুলে বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সওয়াবের আশায় জিলাপি বা অন্য মিষ্টি বা খেচুড়ি বা তেহারির মাধ্যমে তবারকের ব্যবস্থার। লোকদেরকে দলবেধে এক মসজিদ থেকে অন্য মসজিদে তবারকের জন্য দৌড়াতেও দেখেছি। অবশ্য সকলেই নয়। ছোট বেলায় দেখতাম মৌলভী সাহেব বা হুজুররা অনুসারিদের নিয়ে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে পালাক্রমে মিলাদ পড়িয়ে বেড়াচ্ছে আর উদর পূর্তি করছে। বর্তমানে আমার এলাকাতে এ রেওয়াজ নেই বললেই চলে। তবে বাংলাদেশের সব এলাকা থেকে এ বিদাত উঠে গেছে কিনা জানা নেই। এছাড়া কোন কোন মসজিদ, খানকা ও দরগায় চলতে থাকে বিদাতী পন্থায় যিকিরের মজলিশ, ওয়াজ নসিহাত, তরিকার মজলিশ। মিলাদের নামে, যিকিরের নামে, তবারকের নামে, ইবাদতের নামে মসজিদে হট্টগোলেরও সৃষ্টি হয়, যা দ্বীনের মধ্যে বিদআত ছাড়া কিছু নয়। প্রকৃতপক্ষে হৈ-হল্লা যেখানে হয়, সেখানে ইবাদতের পরিবেশ থাকে না, ইবাদতের জন্য চাই নিরিবিলি শান্ত পরিবেশ।

৬.
এ রাতে এক অদ্ভূত পদ্ধতিতে একশত রাকাআত নামায আদায় করা হয়। কেউ কেউ এ নামাজকে সালাতুল আলাফিয়া বা হাজারী নামাযও বলে। একশত রাকাআত নামায পড়ার পদ্ধতিটি হল, প্রতি রাকাআতে সূরা ফাতিহার পর দশ বার সূরা ইখলাস পাঠ করে দু রাকাত পর পর সালাম ফিরাতে হবে। একশত রাকাত নামাযে সূরা ইখলাস পাঠ করতে হয় মোট এক হাজার বার। এ ধরণের নামায পড়ার নিয়ম সম্পূর্ণ নতুন আবিস্কৃত বিদআত। কারণ এই দিনে, এমন সিস্টেমে রাসূল (স:) এবং খোলাফায়ে রাশেদীন কখনো নামাজ পড়েন নি। তাছাড়া ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ, আহমদ বিন হাম্বল, সুফিয়ান সাওরী, আওযাঈ, লাইস প্রমূখ যুগ শ্রেষ্ঠ ইমামগণ কেউ এ ধরণের বিশেষ নামায পড়ার কথা বলেননি।

৭.
এ রাতে শবীনা খতম পড়া হয় অনেক জায়গায়। মাইক দ্বারা শবীনা খতম পড়া নাজায়েয। যারা খতম পড়েন এবং আয়োজন করেন তাদের কেউই কুরআনের পূর্ণ আদব রক্ষা করতে পারেন না। আর শবীনাতে পূর্ণ কুরআন আদবের সাথে শুনার সুযোগাও থাকে না। লোকজন নানান অবস্থায় থাকে। কুরআন শোনা ও আদব রক্ষা করার পর্যায় সকলে নাও থাকতে পারে। তাছাড়া মাইক দ্বারা কুরআন পড়লে তার আওয়াজ বাধ্যতামূলকভাবে মানুষের কানে পৌছানো হয়। মাইকের আওয়অজে রোগীরও ক্ষতি হতে পারে। এমনও হতে পারে, কারও ঘুমের প্রয়োজন। শব্দে তার ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে। কাজেই এ কাজ অবশ্য বর্জনীয়।

৮.
শবে বরাত উপলক্ষ্যে দেখা যায় হরেক রকমের মিষ্টিতে বাজার ছেয়ে যায়। রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, মসজিদ, খানকা, দরগা, পীরের আস্তানা ও অন্যান্য ভবনসমূহে আলোকসজ্জা করা হয়। অথচ আলোকসজ্জার মাধ্যমে বাড়াবাড়ি করা মোটেই সমিচীন নয়।

৯.
শবে বরাতে আধুনিক কালের সবচেয়ে বড় বিদাত দল বেধে বন্ধু-বান্ধবদের এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি বেড়িয়ে বেড়ানো এবং ভাল- মন্দ খাওয়া, পরিশেষে কোল্ড ড্রিংকস্ পান করা। এমনকি কোনরুপ শালীনতা ছাড়াই উঠতি বয়সের ছেলে এবং মেয়ে বন্ধুরা একসাথে বেড়াতে যায়। দল বেধে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, বিশেষ করে জামাই মিস্টি-মিঠায়, ফল-মূল নিয়ে শশুর বাড়ি যাবে এটা একটা নতুন কালচারে পরিনত হয়েছে। আর মুখে পবিত্র রাতের কথা বলা হলেও কোন অবস্থাতেই স্টার জলসা, জিবাংলা, ইটিভি বাংলার সিরিয়ালতো মিস করাই যাবে না। বেড়াতে যাওয়া খারাপ নয়, বেড়াতে গেলে মিষ্টি-মিঠায় নেওয়াও খারাপ নয়। মূলত খারাপ হলো শবে বরাতকে উপলক্ষ্য করা। আর অশ্লিলতা ইসলামে সবর্দায় পরিত্যাজ্য।

মোটকথা শবে বরাত উপলক্ষে শেষ পর্যন্ত দেখা যায় দাওয়াতের ভূরিভোজন করে, মিলাদের তবারক খেয়ে, আনন্দ-ফূর্তি করে, হৈ-হুল্লোড় করে, দাড়িয়ে বা বসে নামাজই পড়া সম্ভব হচ্ছে না। এমনিক অন্যান্য ইবাদতও করা সম্ভব হচ্ছে না। কেননা খেতে খেতেই, বেড়াতে বেড়াতেই দেহ ক্লান্ত, অবসন্ন। ইবাদত বন্দেগী করবে কি করে? তার মধ্যে কেউ কেউ মনের সাথে যুদ্ধ করে, লোক লজ্জার ভয়ে মসজিদে ইবাদতের জন্য গেলেও ফজরের নামাজের আগে এসে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম থেকে উঠে দেখে সকাল গড়িয়ে দুপুর হবার উপক্রম। শবে বরাতের রাতে কপালের প্রথম লিখন হলো ফজরের নামাজ না পড়া। সারা রাত জেগে নফল ইবাদত করলেও ফজরের দু’রাকাত ফরজ নামাজের সমতুল্য হবে কি? কি সুন্দর ইবাদতের নমূনা! অবশ্য মুমিনদের কথা, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কথা আলাদা।

আমাদের দেশের মুসলমানদের অবস্থা 'আসল ঘরে মশাল নেই, ঢেঁকি ঘরে চাঁদোয়া’র মত। লালসালু উপস্যাসে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্ যথার্থই বলেছেন, 'শষ্যের চেয়ে টুপি বেশি, ধর্মের আগাছা বেশি।' তাই বিদাত থেকে বেচে আমাদের ধর্মের মূলে ফিরে আসতে হবে। কেননা বিদাত হল এমন আবিষ্কার যা করার অনুমতি আল্লাহ দেননি। ইহুদি- খ্রিষ্টানদের বৈশিষ্ট্য ছিল তারা ধর্মে নতুন কিছু ঢুকাত। এভাবে কম বেশি করতে করতে তারা নিজেরা নিজেদের ধর্মকেই পাল্টে ফেলেছে, হয়ে গেছে সম্পূর্ন ভ্রষ্ট। তেমনিভাবে মুসলমানদের মাঝেও এই কুব্যাধি ঢুকে পড়েছে। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সন্তষ্টি অর্জনের জন্য নামাজ, রোজা, দান-ছদকা, কুরআন পাঠ, দোয়া-মোনাজাত, রাত্রি জাগরণ নেক আমল এ বিষয়ে কোন সন্দেহে নেই। তবে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে এ রাতকে উদ্দেশ্যকরে কিছু করা বা কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থি কোন প্রকার কোন আনুষ্ঠানিকতা করা থেকে। আমাদের সকল সন্দেহের উর্ধ্বে থেকে দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাষ করতে হবে যে, রসুল (স:), সাহাবা বা সলফে সালেহীনদের সকলেই সব ধরনের বিদাত থেকে মুক্ত ছিলেন ও থাকার পরামর্শ দিতেন। তাই আসুন, আমরা নিজেরা বিদআত থেকে বাঁচি, সাথে সাথে বাঁচানোর চেষ্টা করি আমাদের পরিবার, পরিজন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমিন।

-
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
kbasher74@gmail.com


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Wrong, Tradition, Culture, Sin, Almighty, Shab-e-barat, Muslim, Islam