সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

gift-of-ramadan.jpg

বড় প্রাপ্তি, বড় আনন্দ রমজানে আল্লাহতা’লার উপহার

নিকট আতীতে আমাদের পূর্ব পরুষগণ আজকের প্রজন্মের ভাষায় তুলনামূলকভাবে তাদের মত এতটা জ্ঞানী ছিলেন না। সে বিতর্কে না গিয়ে অন্তত এ টুকু বলা যায়, তখন এতটা অশান্তিও ছিল না। তাদেরই সন্তান হয়ে, মুসলমান পরিচয় দিয়েও আমরা আমাদের ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআন পড়ি না, আল-কুরআন নিয়ে গবেষনা করিনা।

পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ যখন আকাশের সীমানায় ভেসে উঠে মানুষের দৃষ্টি গোচরে আসে, তখন থেকেই শুরু হয় সিয়াম সাধনার মাস। এ মাস বড় প্রাপ্তির, বড় আনন্দের। সারা বছর ভরে হৃদয়ে সঞ্চিত পাপের বোঝা থেকে নিজেকে মুক্ত করার মাস। এ মাসে মানুষের আত্মা তার স্রষ্টাকে খুঁজে পাবার জন্য নতুন করে জেগে ওঠে। শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার বা বেঁচে থাকার স্পৃহা জাগে। নতুন করে নিজেকে খুঁজে পেতে চায়। এ মাসেই আল্লাহতা’লা তার বান্দাদের জন্য অফুরন্ত শান্তি ও মুক্তি তার নিজ হস্তে প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন।

এ মাসেরই লায়লাতুল কদর নামক রজনীতে আল্লাহতা’লা তার বান্দাদের মুক্তির সনদ শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ (আসমানী কিতাব) আল-কুরআন হযরত জীবরাঈল (আঃ) এর মাধ্যমে তারই প্রিয় রাছুল, আখেরী নবী হযরত মোহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট প্রেরণ করা শুরু করেন। যে গ্রন্থ বিশ্ব মানবের জীবন ব্যবস্থার সঠিক সমাধান তুলে ধরে। যে গ্রন্থ পরকালীন মুক্তির সাথে সাথে ইহকালীন সুস্থ ও শান্তিময় সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিক নির্দেশ দেয়। এই লায়লাতুল কদর রজনীকে আল্লাহতা’লা এ মাসের শেষ দশ রজনীর বেজোড় রজনীতে অনুসন্ধ্যানের তাগিদ দিয়েছেন, যে রজনীকে তিনি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে ঘোষনা করেছেন।

সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে মুমিন বান্দারা আত্মিকভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। তাই আল্লাহ তাআলা রমজান মাসে তাঁর রহমতের দরজা অবারিত করে দেন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘রমজান মাসে আমার উম্মতকে পাঁচটি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা আমার পূর্ববর্তী কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি।  

  • রমজানের প্রথম রাতে আল্লাহ তাদের দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন, আর আল্লাহ যার দিকে দৃষ্টি দেন, তাকে কখনো শাস্তি প্রদান করেন না।
  • সন্ধ্যার সময় তাদের মুখ থেকে যে গন্ধ বের হয়, তা আল্লাহর কাছে মেশকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম।
  • প্রত্যেক দিনে ও রাতে ফেরেশতারা রোজাদারদের জন্য দোয়া করেন।
  • আল্লাহ তাআলা তাঁর বেহেশতকে বলেন, 'তুমি আমার বান্দার জন্য সুসজ্জিত ও প্রস্তুত হও! আমার বান্দারা অচিরেই দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট থেকে অব্যাহতি পেয়ে আমার বাড়িতে ও আমার সম্মানজনক আশ্রয়ে এসে বিশ্রাম নেবে। 'রমজানের শেষ রাতে আল্লাহ তাদের সব গুনাহ মাফ করে দেন।’ এক ব্যক্তি বলল, ‘এটা কি লাইলাতুল কদর?’  রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘না,  তুমি দেখোনি শ্রমিকেরা যখন কাজ শেষ করে, তখনই পারিশ্রমিক পায়?’ (বায়হাকী)

রোযা এবং আল-কুরআন এর গুরুত্ব সম্পর্কে এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রোযা এবং কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোযা বলবে, আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কুরআন বলবে,  আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং আমার সুপারিশ কবুল করুন। তখন দু’জনের সুপারিশই গ্রহণ করা হবে। - মুসনাদে আহমদ হাদীস: ৬৫৮৯; তবারানী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৩/৪১৯।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা কেন যেন আল-কুরআনকে পাশ কেটে যেত চাই। আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজ, এমনকি তৃণমূলে আমরা যারা আছি, তাদেরও অনেকেই দেশ বিদেশের অসংখ্য বই পড়ি, পড়েছি কিন্তু কৌতুহল বশত ও কখনও আল-কুরআন কে পড়তে চাইনা! দাশ ক্যাপিটালে কী আছে আমরা জানি, চে গুয়েভারার 'মা' বই পড়ে বিপ্লবী হবার স্বপ্ন দেখেছি, সামন্তবাদ, গণতন্ত্র, সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র, ডারউইনের On The Origin Of Species পড়ে বিবর্তনবাদের উপর বিশেষজ্ঞ হয়ে নিজেরা নাস্তিক্যবাদ গ্রহণ করেছি পাশাপাশি কোমলমতি কিশোর-তরুণদের নাস্তিক্যবাদ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছি! অথচ মানুষের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করার কথা বললেও বিশ্ব মানবতার মুক্তির সনদ 'আল-কুরআন'কে আমরা সন্তর্পনে এড়িয়ে গেছি।

নিকট আতীতে আমাদের পূর্ব পরুষগণ আজকের প্রজন্মের ভাষায় তুলনামূলকভাবে তাদের মত এতটা জ্ঞানী ছিলেন না। সে বিতর্কে না গিয়ে অন্তত এ টুকু বলা যায়, তখন এতটা অশান্তিও ছিল না। তাদেরই সন্তান হয়ে, মুসলমান পরিচয় দিয়েও আমরা আমাদের ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআন পড়ি না, আল-কুরআন নিয়ে গবেষনা করিনা। এটা আমাদের জন্য সত্যই বড় বেদনার ও লজ্জারও বটে। তাই আসুন, আমরা আমাদের শেকড় থেকে ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির জন্য পাথেয় সংগ্রহে সচেষ্ট হই।

পরিশেষে, রমজান মাসের উপর আরেকটি হাদিসের বর্ণনা তুলে ধরে লেখাটি শেষ করছি। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আল্লাহ তাআলার কসম! মুসলমানদের জন্য রমযানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমযান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা মুমিনগণ এ মাসে (গোটা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনীমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ।' - মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৮৩৬৮, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস ৮৯৬৮, সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ১৮৮৪, তাবারানী হাদীস ৯০০৪, বাইহাকী শুয়াবুল ঈমান, হাদীস ৩৩৩৫।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Ramadan, Quran, Allah, religion, path, paradise, humanity, righteous