সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

the-story.jpg

মূল: জোসেফ শেরিডান লে ফ্যানু কারমিল্যা - পর্ব ১

অনেক শান্ত আর নি:সঙ্গ জায়গাটা। বনের একটু উঁচু অংশে আমাদের বাড়ি। এখানে আসার রাস্তাটা খুব সরু আর অনেক পুরোনো। বাড়ির সামনে একটা ঝুলনসেতু আছে। সেতুটা সবসময় নামানোই থাকে।

ভূমিকা:
নিচের কাহিনিটার সাথে একটা কাগজে ড. হেসিলিয়াসের লেখা কিছু ব্যাখ্যা ছিল। রহস্যময় বিষয়ের উপর তার নিজের লেখা প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যাখ্যাটা দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

প্রবন্ধটা চমৎকার ভাবে গুছিয়ে লেখা। বোঝাই যায় এ সম্বন্ধে লেখকের জ্ঞান যথেষ্ট। এই বিষয়ের উপর তার সব লেখা একসাথে করতে গেলে একটা বিশাল বই হয়ে যাবে।

ঘটনাটার সাথে জড়িত মেয়েটার পরিচয় গোপন রাখলাম। অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম, বিজ্ঞ ডক্টরের রচনার কোন অংশও এই লেখায় উল্লেখ করব না।

ড. হেসিলিয়াসের এই লেখাটা অনেকদিন আগের। এক ভদ্রমহিলার কাছ থেকে উনি এই গল্পের সব তথ্য পেয়েছিলেন। সেই ভদ্রমহিলা এর মাঝে মারা গেছেন শুনে আমি একটু চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।

যদিও যে গল্পটা ওই ভদ্রমহিলা বলেছেন, তাতে আর নতুন কিছু তিনি যোগ করতে পারতেন বলে আমার মনে হয় না।

 ১: প্রথম আতঙ্ক

দূর্গে থাকলেও আমরা স্টাইরিয়ার (দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রিয়ার একটি প্রদেশ-অনুবাদক) অভিজাত কেউ নই। এখানে ভালোভাবে চলার জন্য বছরে আটশো বা নয়শো পাউন্ডই যথেষ্ট। এতেই আমরা এখানকার ধনী পরিবারগুলোর একটা। আমার বাবা একজন ইংরেজ। আমার নামটাও একটা ইংরেজ নাম। আমি অবশ্য কখনো ইংল্যান্ডে যাইনি। কিন্তু এখানে, সভ্যতা থেকে দূরে এই জায়গায়, সবকিছুই খুব সস্তা। আরও অনেক টাকা থাকলেও তাতে আমাদের বিলাসী জীবন যাপনে তেমন কোন উনিশ-বিশ হত বলে আমার মনে হয় না।

আমার বাবা অস্ট্রিয়ায় চাকরি করতেন। চাকরি শেষে পেনশন আর পৈতৃক সম্পত্তি বেচে যা পেয়েছিলেন, তা দিয়ে মুলামুলি করে এই জমিদারবাড়ি আর জমি কিনেছেন।

অনেক শান্ত আর নি:সঙ্গ জায়গাটা। বনের একটু উঁচু অংশে আমাদের বাড়ি। এখানে আসার রাস্তাটা খুব সরু আর অনেক পুরোনো। বাড়ির সামনে একটা ঝুলনসেতু আছে। সেতুটা সবসময় নামানোই থাকে। পরিখাটা মাছ দিয়ে ভরা, প্রচুর হাঁস ঘুরে বেড়ায় সেখানে, আর আছে সাদা ওয়াটার লিলি।

আর এই সবকিছু ছাপিয়ে উঠে গেছে ভূতুড়ে চ্যাপেল আর দূর্গচুড়াগুলো। অন্যসব দূর্গের মত এটার সামনের দিকেও প্রচুর জানালা আছে।

দূর্গের দরজার সামনে থেকেই রাস্তার শুরু। আরো সামনে তাকালে রাস্তায় ছবির মত একটা বাঁক দেখা যায়। সেখান থেকেই জঙ্গলটার শুরু। আর যে নদীটা জঙ্গলের গভীরে হারিয়ে গেছে, সে নদীর ওপর দিয়ে ভূতুড়ে সেতুটা জোড়া দিয়েছে রাস্তাটাকে।

আগেই বলেছি জায়গাটা খুব নি:সঙ্গ। হলঘরের দরজা থেকে তাকালে জঙ্গলটা অনেকখানি দেখা যায়। বাঁ দিকে ১৫ মাইলের মত আর ডানে ১২ মাইল। কাছেপিঠে লোকবসতি বলতে বাঁ দিকে ৭ মাইলের মত গেলে একটা গ্রামে মানুষ পাওয়া যাবে। কাছাকাছি দূর্গ বলতে বুড়ো জেনারেল স্পিলসডর্ফেরটা, তাও ২০ মাইল দূরে।

‘কাছাকাছি লোকবসতি’ বলেছি, কারণ পশ্চিমে, জেনারেল স্পিলসডর্ফের দূর্গের দিকে তিনমাইলের মত গেলে একটা পরিত্যক্ত গ্রাম পাওয়া যাবে। ছাদহীন একটা চার্চ আছে ওখানে। আর আছে কার্নস্টিন পরিবারের কবরস্থান, এখন অবশ্য পরিবারের কেউ আর বেঁচে নেই। গভীর জঙ্গলে ওদের পারিবারিক দূর্গটা পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তুপগুলো পাহারা দিচ্ছে।

এই ধ্বংসস্তুপটা চোখে পড়ার মত, কিন্তু কেমন যেন বিষণ্ণ।

আমার বাবা, খুব দয়ালু একজন মানুষ, ক্রমেই বুড়িয়ে যাচ্ছেন; আর আমি, এই গল্প যখন বলছি তখন আমার বয়স ঊনিশ। তাও প্রায় আটবছর আগের কথা। পরিবার বলতে আমি আর আমার বাবা; আমার মা, একজন স্টাইরিয়ান মহিলা, আমার জন্মের কিছু পরেই মারা যান। আমি অবশ্য একজন ভালোমানুষ গভর্ণেস পেয়েছি। আমি যখন শিশু, তখন থেকেই তিনি আমার দেখাশুনা করছেন। এমন কোন স্মৃতি মনে করতে পারিনা যেখানে গভর্ণেসের মোটাসোটা পরিচিত মুখটা নেই। এই হচ্ছেন ম্যাডাম পেরোডন, বার্ণের অধিবাসী। অনেক অল্প বয়সে আমি আমার মাকে হারিয়েছি। যে মায়ের কিছুই আমার মনে নেই, সেই মায়ের অভাব কিছুটা পূরণ করেছেন এই মহিলা। উনি আমাদের ডিনারের তৃতীয় ব্যক্তি। চতুর্থজন হচ্ছেন মাদমোয়াজেল ডে লা-ফন্টেইন। অভিজাত ভদ্রমহিলা, কিন্তু আমি বলব ‘গভর্ণেসের চূড়ান্ত পর্যায়’। ইনি ফরাসী এবং জার্মান ভাষা জানেন, আর ম্যাডাম পেরোডন জানেন ফরাসী এবং ভাঙা ভাঙা ইংলিশ। আমি আর বাবা প্রতিদিন ইংরেজিতে কথা বলি। কিছুটা দেশাত্ববোধ আর কিছুটা, ভাষাটা যেন এখান থেকে হারিয়ে না যায় সেজন্য। ব্যাপারটা শেষাবধি শব্দদূষণে পরিণত হল। অপরিচিত লোকজন শুনে খুব মজা পেত। আমার বয়সী আরও কয়েকটা মেয়ে মাঝে মাঝে বেড়াতে আসত, দুয়েকবার আমিও বেড়াতে গিয়েছি।

আমাদের সামাজিক যোগাযোগের উৎস বলতে এই; অবশ্য ছ’সাত মাইল দূরের প্রতিবেশীরাও কখনো কখনো আসে। এটুকু বলতে পারি, এসব ধরলেও আমার জীবনটা একরকম নি:সঙ্গই কেটেছে।

আমার জীবনের সবচেয়ে পুরনো যে স্মৃতিগুলো আছে, প্রথমবারের ঘটনাটা তখনকার। আর ঘটনাটা আমার মনের ওপর গভীর ছাপ ফেলে যায়।

নার্সারীটা যদিও শুধুই আমার জন্য, কিন্তু অনেক বড় একটা ঘর ছিল। দূর্গের উপরের দিকের একটা ঘর। ছাদটা ছিল ওক কাঠের। আমার তখন ছ’বছর বয়স হবে, একরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। বিছানায় শুয়েই ঘরের চারদিকে চোখ বুলালাম কিন্তু কোথাও নার্সারির মেইডকে দেখতে পেলাম না। আমি একা, আমার নার্সও সেখানে ছিল না। আমি অবশ্য ভয় পাইনি, কারণ আমি সেইসব সুখী শিশুদের একজন, যাকে ইচ্ছে করেই কখনো ভূতের গল্প, পরীর গল্প শোনানো হয় নি। যে গল্পগুলো শোনার পর দরজায় শব্দ হলে বা মোমবাতির কাঁপা আলোয় ছায়াদের নাচানাচি দেখলে একটা বাচ্চা ভয়ে মাথা ঢেকে ফেলে। সবাই আমাকে অবহেলা করছে ভেবে আমি দু:খে কষ্টে ফোঁপাতে শুরু করলাম, চিৎকার করে কান্না শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন আমাকে অবাক করে দিয়ে খুব সুন্দর চেহারার একটা মেয়ে আমার বিছানার পাশে এসে হাজির। হাঁটু গেড়ে বসে আছে, চাদরের নিচে হাত। 

আমি ফোঁপানো বন্ধ করে খুশি মনে মেয়েটার দিকে তাকালাম। মেয়েটা বিছানায় আমার পাশে শুয়ে পড়ল। হাসিমুখে আমাকে কাছে টেনে আদর করতে শুরু করল। আমি আবার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ আবার আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। মনে হচ্ছিল আমার বুকের খুব ভেতরে কেউ দুটো সুঁচ একসাথে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমি খুব জোরে কেঁদে উঠলাম। আমার দিকে তাকিয়ে মেয়েটা পিছু হটল। মেঝের ওপর নিচু হয়ে খাটের নিচে ঢুকে পড়ল। জীবনে প্রথমবারের মত আমি ভয় পেলাম, এবারের চিৎকারটা দিলাম সর্বশক্তি দিয়ে। নার্স, নার্সারীমেইড, হাউসকীপার সবাই এবার দৌড়ে এল। আমার কাছে সব শুনে যতভাবে পারে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। 

যদিও আমি তখন ছোট, আমি বুঝতে পারছিলাম ওদের চেহারা উদ্বেগ আর ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ওরা খাটের নিচে, ঘরের কোণে, টেবিলের নিচে, কাপবোর্ডের ভেতর খুঁজল। হাউসকীপার ফিসফিস করে নার্সকে বলল: “বিছানার ফাঁকা জায়গায় হাতটা রেখে দেখ; তুমি শোওনি, কিন্তু কেউ একজন শুয়েছিল এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত; জায়গাটা এখনো গরম হয়ে আছে।”

নার্সারী-মেইড আমার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল আর তিনজনই আমার বুক, যেখানে সুঁচ ফোটার ব্যথা পেয়েছিলাম, পরীক্ষা করে বলল, ওখানে সুঁচ ফোটার কোন চিহ্ন নেই। হাউসমেইড আর দুজন চাকর, যারা নার্সারী দেখাশোনা করে, সারারাত বসে নার্সারী পাহারা দিয়েছে। এরপর থেকে আমার চৌদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত, সবসময় একজন না একজন নার্সারীতে আমার সাথে থাকত।

এ ঘটনার পর অনেকদিন পর্যন্ত আমি খুব নার্ভাস ছিলাম। ফ্যাকাশে চেহারার বয়স্ক একজন ডাক্তারকে ডাকা হয়েছিল। তার লম্বা মুখে স্মলপক্সের চিহ্ন আর চেস্টনাটের পরচুলার কথা আমার খুব ভালো মনে আছে। অনেকদিন ধরে সে দু’দিন পর পর এসে আমাকে ওষুধ দিয়ে যেত। আমার একটুও ভাল লাগত না।

এই ভৌতিক ঘটনার পরদিনও আমি আতঙ্কিত ছিলাম। এমনকি দিনের বেলাও একমুহুর্তের জন্য একা থাকার সাহস পাইনি।

আমার মনে আছে বাবা আমাকে দেখতে এসেছিলেন। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে নার্সকে নানান প্রশ্ন করছিলেন এবং নার্সের একটা উত্তর শুনে প্রাণখুলে হেসেওছিলেন। আমার কাঁধ চাপড়ে আমাকে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এটা শুধুই একটা স্বপ্ন, আর স্বপ্ন ব্যথা দিতে পারে না।

কিন্তু আমি স্বস্তি পাই নি। কারণ আমি জানি ওই অদ্ভুত মহিলাটা কোন স্বপ্ন ছিল না। আমি আসলেই অনেক ভয় পেয়েছিলাম।

আমি একটু শান্ত হয়েছিলাম নার্সারী-মেইডের কথায়। সে বলেছিল যে সে-ই এসেছিল রাতে, বিছানায় আমার পাশে শুয়েছিল, আমি আধোঘুমে ছিলাম তাই তাকে চিনতে পারিনি। নার্সও গল্পটাতে সায় দিয়েছিল, কিন্ত আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারিনি।

নার্স আর হাউসকীপারের সাথে কালো পোষাক পরা এক বয়স্ক যাজক এসেছিলেন শেষবেলায়। প্রথমে ওদের সাথে কথা বললেন, তারপর আমার সাথেও নরম সুরে কথা বললেন; চেহারা দেখে মনে হয় খুবই ভালো এবং ভদ্র একজন মানুষ। বললেন এখন আমরা প্রার্থনা করব। আমাকে হাতদুটো একসাথে করে বলতে বললেন, “হে ঈশ্বর, যীশুর দোহাই আমাদের প্রার্থনা শোনো।” ঠিক এই কথাগুলোই বলেছিলেন যাজক, কারণ পরে বছরের পর বছর ধরে নার্স আমাকে প্রার্থনায় এই কথাগুলো বারবার বলিয়েছিল।

তার সাদাচুলের সৌম্যকান্তি চেহারা, তার কালো পোষাকের কথা আমার খুব ভালো মনে আছে। মনে আছে সাদামাটা, উঁচু, বাদামী ঘরটায় তিনশো বছরের পুরনো আসবাবপত্রের মাঝে তার দাঁড়িয়ে থাকা। মনে পড়ে তার সাথে জাফরির ফাঁক দিয়ে আসা মৃদু আলোর কথাও, যাজক এবং তিন মহিলার হাঁটু গেড়ে বসা, কম্পিত আর ব্যগ্র কন্ঠে অনেক লম্বা সময় ধরে প্রার্থনা করা। ওর আগের কথা যেমন আমার মনে নেই, ওর ঠিক পরের ঘটনাগুলোও ঠিক পরিষ্কার না; কিন্তু যে ঘটনা আমি বর্ণনা করলাম, তার প্রতিটি দৃশ্য এখনো আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে।

-
এই গল্পের দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

carmilla, story, episode, 1, series, english, translation, literature, thriller