সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

Abstract-Art-Painting-Artist-Nestor-Toro-5.jpg

মূল: জোসেফ শেরিডান লে ফ্যানু কারমিল্যা - পর্ব ২

আমি এগিয়ে গেলাম। মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গেছে, কিন্তু মারা যায়নি এটা নিশ্চিত। বাবা হালকা পাতলা ডাক্তারী জানেন, তিনি মেয়েটার নাড়ি টিপে দেখলেন, মেয়েটার মাকে আশ্বস্ত করলেন, যদিও খুব দূর্বল, কিন্তু নাড়ি চলছে।

এই গল্পের ১ম পর্বটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

অতিথি
এখন আমি যে ঘটনাটা বলব, সেটা এতই অদ্ভুত যে, গল্পটা বিশ্বাস করতে হলে আমার সততার উপর তোমাকে আস্থা রাখতে হবে। শুধু সত্যি বললে কম বলা হবে, ঘটনাটা আমার নিজের চোখে দেখা।

গ্রীষ্মের এক সুন্দর সন্ধ্যায়, বাবা আমাকে তার সাথে দূর্গের সামনের বনে ঘুরতে যেতে বলল। মাঝেই মাঝেই বলে।

হাঁটতে হাঁটতে বাবা বলল, ভেবেছিলাম জেনারেল স্পিলসডর্ফ শীঘ্রিই আমাদের সাথে দেখা করতে আসবে, কিন্তু তা মনে হয় হচ্ছেনা।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই তার আসার কথা। আমরা আশা করছিলাম পরের দিনই তিনি আসবেন। তার সাথে তার এক ভাতিজিরও আসার কথা, মাদমোয়াজেল রাইনফেল্ট। আমার সাথে এর আগে কখনো দেখা হয়নি, কিন্তু শুনেছি চমৎকার একটা মেয়ে। অনেক আশা করেছিলাম আমাদের দারুন কিছু সময় কাটবে। খুব মন খারাপ হল। শহরের কোন মেয়ে চিন্তাও করতে পারবে না আমার বয়সী একটা মেয়ের পক্ষে এতটা হতাশ হওয়া সম্ভব। অনেক দিন ধরেই এই নতুন অতিথির বেড়াতে আসার অপেক্ষায় আছি।

: কত তাড়াতাড়ি আসবেন? জিজ্ঞেস করলাম।
: সামনের শরতের আগে না। তাও ধর দু’মাস হবে - বাবা জবাব দিল।
: আর আমি খুশি যে মাদমোয়াজেল রাইনফেল্টের সাথে তোমার পরিচয় হয়নি।
: কেন? খারাপও লাগল আবার কৌতুহলও হল।

বাবা জবাব দিল, কারণ বেচারি মারা গেছে। তোমাকে বলতে একদম ভুলে গেছি, অবশ্য বিকেলে যখন জেনারেলের চিঠি পেলাম, তখন তুমি ঘরে ছিলে না।

আমি প্রচন্ড একটা ধাক্কা খেলাম। জেনারেল অবশ্য ছ’সাত সপ্তাহ আগের চিঠিতে লিখেছিলেন মেয়েটার শরীর ভালো না, কিন্তু তেমন কোন বিপদের আশঙ্কা করেন নি।

: এই যে জেনারেলের চিঠি - বাবা চিঠিটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
: বেচারা খুব ভেঙে পড়েছে; আমার তো মনে হয় নিজেকে ব্যস্ত রাখতেই চিঠিটা লিখেছে ও।

আমরা বিশাল লাইম গাছের নিচে একটা বেঞ্চে বসলাম। সূর্য তার সমস্ত বিষন্নতা নিয়ে দিগন্তে অস্ত যাচ্ছে। নদীটা ব্রীজের নিচ দিয়ে, নানান গাছের ফাঁক দিয়ে, স্রোতের বুকে গোলাপী আকাশের প্রতিচ্ছায়া বুকে নিয়ে প্রায় আমাদের পায়ের কাছ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। জেনারেলের চিঠিটা অদ্ভুত, কেমন খাপছাড়া, বেশ কিছু জায়গায় পরস্পরবিরোধী কথা লেখা। চিঠিটা আমি দুবার পড়লাম – দ্বিতীয়বার বাবাকে শুনিয়ে শুনিয়ে – তারপরও সব কথা পরিষ্কার বুঝিনি। সম্ভবত শোক তার মাথা এলোমেলো করে দিয়ে গেছে।

এতে লেখা, আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছি, হ্যাঁ, আমি ওকে এতটাই ভালবাসতাম। বার্থার শেষ দিনগুলোতে তোমাকে লেখা হয়নি। তার আগ পর্যন্ত আমি বিপদের মাত্রাটা বুঝতে পারিনি। ওকে হারিয়ে বুঝতে পেরেছি, কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে। ও নিষ্পাপ একটা মন নিয়ে মারা গেছে, যে কারণে ওর ভবিষ্যত গন্তব্যটা অনেক বেশি সুন্দর হবে। আমাদের আশ্রয়ের সুযোগ গ্রহণকারী শয়তানটার বিশ্বাসঘাতকতাই এর জন্য দায়ী। আমি ভেবেছিলাম বার্থার জন্য সহজ সরল, উচ্ছল আর চমৎকার একজন সঙ্গী এনেছি। হায় ঈশ্বর! কি বোকামী করেছি! তবুও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ আমার মেয়েটা ওর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ না জেনেই মারা গেছে। ওর অসুখের প্রকৃতি বা কলুষতা ওকে জানতে হয়নি। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, আমার জীবনের বাকি দিনগুলো একটা পিশাচকে খুঁজে বের করে নিশ্চিহ্ন করার পেছনে ব্যয় করব। আমার উদ্দেশ্য সৎ আর কাজটা করব সবার ভালোর জন্য। তাই আমার বিশ্বাস আমি সফল হবই। যদিও আমার হাতে এখন পর্যন্ত তেমন কোন সূত্র নেই। সেই থেকে আমি আমার অতি আত্মবিশ্বাস, অহংকার আর অজ্ঞানতাকে দুষছি – কিন্তু বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেছে। আমি এখন গুছিয়ে কিছু বলতে বা লিখতে পারছি না। কোন কিছুতে মন বসাতে পারছি না। যেই মুহূর্তে নিজেকে ফিরে পাব, আমার সমস্ত শক্তি নিয়োগ করব তদন্তের কাজে, আমার ধারণা আমাকে ভিয়েনা পর্যন্ত যেতে হতে পারে। এখন থেকে দু’মাস পর, বা তার কিছু আগেও হতে পারে, শরতের কোন এক সময়, যদি তখনও বেঁচে থাকি, তুমি অনুমতি দিলে তোমার সাথে দেখা করতে আসব। যে কথা আমি এখন কাগজে লিখতে পারছি না, সেই সব কথা তখন তোমাকে বলব। বিদায়। আমার জন্য প্রার্থনা করো বন্ধু।

এভাবেই চিঠিটা শেষ হয়েছে। যদিও বার্থা রাইনফেল্টকে কখনো দেখিনি, তারপরও এই সংবাদে আমার চোখ জলে ভরে গেলো। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। একই সাথে হতাশ।

সূর্য ডুবে গেছে। বাবার হাতে যখন জেনারেলের চিঠিটা ফিরিয়ে দিলাম তখন গোধূলি নেমে এসেছে।

শান্ত একটা সন্ধ্যা। আমরা উদ্দ্যেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। এইমাত্র যে চিঠিটা পড়লাম, সেই চিঠির খাপছাড়া বাক্যগুলো নিয়ে আলাপ করতে লাগলাম। আকাশে যখন চাঁদ দেখা দিল, আমরা তখন দূর্গের রাস্তা থেকে এক মাইল দূরে। ঝুলনসেতুতে মাদাম পেরোডন আর মাদমোয়াজেল ডি লা-ফন্টেইনকে দেখলাম। তারা দু’জন চাঁদের আলো উপভোগ করতে বনেট ছাড়াই বেরিয়ে পড়েছেন।

কাছাকাছি যেতে দু’জনের কথার আওয়াজ শুনতে পেলাম। সেতুর উপর একসাথে সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করলাম।

আমাদের ঠিক সামনেই খোলাপ্রান্তর, যেখান দিয়ে আমরা মাত্রই হেঁটে এসেছি। আমাদের বামে সরু রাস্তাটা হালকা বন থেকে গভীর বনে হারিয়ে গেছে। ডানে সেই রাস্তাটাই ব্রিজ পার হয়ে গেছে। কাছেই একটা টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষ যেটা অতীতে এই পাসটা পাহারা দিত। ব্রিজের পরেই গাছে ছাওয়া বিশাল জমিন উঁচু হয়ে গেছে। ছায়ার মধ্যেও আইভি লতায় ছাওয়া ধূসর পাথর চোখে পড়ে।

দূরের দৃশ্য আর নিচু জমিতে স্বচ্ছ পর্দার মত কুয়াশা জমতে শুরু করেছে; মাঝে মাঝে চাঁদের আলোয় পানি চিকচিক করে ওঠা ছাড়া নদীটা এখন আর পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছেনা।

এমন সুন্দর দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। একটু আগে যে সংবাদ শুনেছি সেটা দু:খজনক; কিন্তু সেটা প্রকৃতির এই শান্ত চেহারায়, বা তার জাদুকরী মোহনীয়তায় কোন ছাপ ফেলেনি।

আমি আর বাবা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছবির মত এই দৃশ্য দেখছি। দুই গভর্ণেসও আমাদের পেছনে দাঁড়িয়ে চাঁদের আলো আর শান্ত প্রকৃতি উপভোগ করছেন।

মাদাম পেরোডন একটু মোটাসোটা, মধ্যবয়স্ক, একটু ভাবুক আর কথায় কথায় কাব্য করেন। কিছুটা মনস্তত্ববিদ, কিছুটা আধ্যাত্ববাদী জার্মান বাবার মেয়ে মাদমোয়াজেল ডি লা-ফন্টেইন ঘোষণা করলেন, এমন প্রবল চাঁদের আলোয় আধ্যাত্মিক সব ঘটনা ঘটে। পূর্ণ চাঁদের আলোর প্রভাবের কথা অবশ্য সবার জানা। স্বপ্নে, পাগলামীতে, দূর্বল স্নায়ুর লোকদের উপরও এই আলো প্রভাব ফেলে, জীবন এবং শরীরের সাথেও এর যোগ আছে। মাদমোয়াজেল তার এক কাজিনের কথা বললেন, যে একটা ব্যবসায়ী জাহাজের মেট ছিল। এমন এক পূর্ণিমার রাতে সে ডেকের উপর চিৎ হয়ে চাঁদের দিকে মুখ করে ঘুমাচ্ছিল। স্বপ্নে দেখে এক বুড়ি তার শরীর খামচে আলাদা করে ফেলছে। তার ঘুম ভেঙে যায়, সে আর কখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারে নি।

উনি বললেন, এই চাঁদ, এই রাত, রহস্যময় শক্তির প্রভাবে ভরা – দেখ, পেছন ফিরে দেখ, দূর্গের জানালাগুলো চাঁদের আলোয় কেমন চকমক করছে, যেন অন্যভুবনের অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছে।

কেমন যেন আলসী লাগছে, কোন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু অন্যের কথা শুনতে খুব ভালো লাগছে; আমি তাকিয়ে তাকিয়ে বাকিদের কথা শুনতে লাগলাম।

: আজ রাতে কেন যেন আমার খুব মন খারাপ লাগছে - বলে বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। ইংরেজির চর্চার জন্য বাবা প্রায়ই উচ্চস্বরে শেকসপীয়ার পড়ে, সেখান থেকে আবৃত্তি করতে শুরু করল:

: ইন ট্রুথ আই নোউ নট হোয়াই আই অ্যাম সো স্যাড
: ইট ওয়্যারিস মি; ইউ সে ইট ওয়্যারিস মি;
: বাট হাউ আই গট ইট-কেম বাই ইট।
: বাকিটা ভুলে গেছি। কিন্তু মনে হচ্ছে দূর্ভাগ্য যেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। জেনারেলের চিঠির জন্যই বোধহয় এমন মনে হচ্ছে।

ঠিক এসময় রাস্তায় অনেকগুলো ঘোড়ায় টানা গাড়ির চাকা আর খুরের শব্দ শুনতে পেলাম আমরা।

শব্দ শুনে মনে হচ্ছে ব্রিজের ওপাশের উঁচু জমি থেকে কেউ আসছে। শীঘ্রিই গাড়িটা আমাদের চোখে ধরা পড়ল। প্রথমে দু’জন ঘোড়সওয়ার ব্রিজ পেরোল, তারপর চার ঘোড়ায় টানা গাড়ি আর পেছনে আরও দু’জন ঘোড়সওয়ার।

গাড়িটা দেখে মনে হচ্ছে কোন সেনা কর্মকর্তার হবে, আমদের সবার মনোযোগ তখন সেদিকে, সচরাচর তো এমনটা দেখা যায় না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনা আরও উত্তেজনার দিকে মোড় নিল। উঁচু ব্রিজটা পেরোনো মাত্র একজন আঁতকে উঠল, তার সাথে সাথে বাকিরাও সতর্ক হয়ে গেল। পরপরই সব ঘোড়সওয়ার একসাথে আমাদের দিকে তীর বেগে ছুটে এল।

গাড়ি থেকে মহিলা কণ্ঠের চিৎকার ভেসে এল। আমাদের সবার কৌতুহল তখন তুঙ্গে, ভয়ও পাচ্ছি; শুধু বাবা শান্ত আর বাকিরা ভয়ে ভয়ে এগোচ্ছে।

খুব বেশিক্ষণ আমাদের অপেক্ষা করতে হল না। দূর্গে আসার পথে ঝুলনসেতুর আগে রাস্তার একপাশে বড় একটা লাইম গাছ আর অন্যপাশে একটা পাথরের ক্রস আছে, যেটা দেখে ভয়ে ঘোড়াগুলো আরও জোরে ছুটতে গিয়ে গাছের শেকড়ের সাথে চাকা বাধিয়ে ফেলল।

পরিষ্কার বুঝতে পারলাম কি ঘটতে যাচ্ছে। যাতে দেখতে না হয় তাই মুখ ঘুরিয়ে চোখ ঢেকে ফেললাম। আমার এক গভর্ণেস চিৎকার করে উঠলেন।

কৌতুহলের কারণে চোখ না খুলে পারলাম না। কি থেকে কি হলো কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। দু’টো ঘোড়া মাটিতে, শূণ্যে দু’চাকা তুলে গাড়িটা কাত হয়ে আছে, লোকজন ঘোড়াগুলোকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে। নেত্রীগোছের একজন মহিলা গাড়ি থেকে বেরিয়ে হাত মুঠি পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর মাঝে মাঝে রুমালটা তুলে চোখ মুছছেন। গাড়ির দরজা দিয়ে একটা অল্পবয়সী মেয়েকে বের করা হল, দেখে নিস্তেজ মনে হল। বাবা এরই মধ্যে মহিলার পাশে চলে গেছেন, হ্যাটটা হাতে, এবং নিশ্চয়ই দূর্গের সহায়তার প্রস্তাব দিচ্ছেন। দেখে মনে হল না মহিলা বাবার কথা শুনতে পাচ্ছেন, বা গাড়ি থেকে বের করা মেয়েটাকে ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পাচ্ছেন। মেয়েটাকে নদীতীরের ঢালে শুইয়ে দেয়া হল।

আমি এগিয়ে গেলাম। মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গেছে, কিন্তু মারা যায়নি এটা নিশ্চিত। বাবা হালকা পাতলা ডাক্তারী জানেন, তিনি মেয়েটার নাড়ি টিপে দেখলেন, মেয়েটার মাকে আশ্বস্ত করলেন, যদিও খুব দূর্বল, কিন্তু নাড়ি চলছে। মহিলা বাবার দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার ভেঙ্গে পড়লেন, আমার কাছে ভঙ্গিটা নাটকীয় মনে হলেও অনেকের জন্য হয়ত এটাই স্বাভাবিক আচরণ।

বোঝা যায় বয়সকালে মহিলা সুন্দরী ছিলেন, এবং তাও চোখধাঁধানো সুন্দরী। লম্বা, কিন্তু শুকনো না, কলো ভেলভেট পরনে, ফ্যাকাশে, যদিও এখন বিচলিত মনে হচ্ছে, কিন্তু চেহারায় গর্ব আর নেতৃত্বের ছাপ আছে।

: বিপদের কি কোন শেষ নেই? আমি কাছে যেতে যেতে শুনতে পেলাম। মহিলা তার মেয়ের হাত চেপে ধরে আছেন।
: আমি এমন একটা কাজে যাচ্ছি যখন এক ঘন্টা নষ্ট হলেই সব শেষ হয়ে যাবে। সেখানে আমার মেয়েটার সুস্থ হতে কত সময় লাগবে কে জানে। ওকে ছাড়াই আমার যেতে হবে, দেরি করার উপায় নেই। স্যার, আপনি কি বলতে পারবেন কাছের গ্রামটা কত দূরে? ওকে ওখানেই রেখে যেতে হবে, না ফেরা পর্যন্ত আর ওর সাথে আমার দেখা হবে না, তাও অন্তত তিন মাস।

কোট ধরে বাবাকে একপাশে টেনে এনে ফিসফিস করে বাবাকে বললাম,
: ওহ! বাবা, ওনাকে বল না মেয়েটাকে আমাদের সাথে রেখে যেতে – দারুন ব্যাপার হবে। বল না।
: ম্যাডাম, আপনি কি আপনার মেয়েকে আমার মেয়ে এবং ওর গভর্ণেস ম্যাডাম পেরোডনের তত্বাবধানে রেখে যেতে সাহস পাবেন? আপনি না ফেরা পর্যন্ত এখানে আপনার মেয়ে আমাদের অতিথি হিসেবে থাকবে। ওর যত্নআত্তির কোন ত্রুটি হবে না, এটুকু কথা আমি আপনাকে দিতে পারি।
: ওকে এখানে রেখে যাওয়াটা আপনার ভালো ব্যবহারের সুযোগ নেয়া হবে - ভদ্রমহিলা বললেন।
: ব্যাপারটা বরং উল্টো, আপনি যদি রাজি হন আমরা খুব খুশি হব। সম্প্রতি একটা খবর শুনে আমার মেয়েটা খুব মুষড়ে পড়েছে, বাড়িতে একজন অতিথি আসবে সেই অপেক্ষায় ও উন্মুখ হয়ে ছিল। আপনি যদি আপনার মেয়েটাকে আমাদের তত্ত্বাবধানে রেখে যাবার সাহস পান, তাতে আমার মেয়েটা অনেক খুশি হবে। তাছাড়া কাছের গ্রামটাও অনেক দূরে, সেখানে আপনার মেয়েকে রাখার মত কোন সরাইখানাও পাবেন না, আর এই অবস্থায় আপনার মেয়েকে নিয়ে যাওয়াটা নি:সন্দেহে বিপজ্জনক হবে। আর, আপনার কথা অনুযায়ীই, আপনি যদি আপনার যাওয়া বাতিল না-ই করতে পারেন, আজ রাতেই মেয়েকে রেখে আপনার যেতে হবে, এবং আপনার মেয়ের দেখভালের নিশ্চয়তা আপনি আর কোথাও পাবেন না।

ভদ্রমহিলার ভেতর অন্যরকম কিছু একটা আছে, তার কথায় বা আচরণে অন্যরা প্রভাবিত হয়, আভিজাত্য ছাড়াও যেন তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ।

এরই মধ্যে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে ঘোড়া জুড়ে দেয়া হয়েছে।

ভদ্রমহিলা তার মেয়ের দিকে কেমনভাবে যেন তাকালেন। তারপর ইশারায় বাবাকে তার সাথে একটু দূরে যেতে বললেন। তারপর বাবার সাথে এমন ভাবে কথা বললেন যেভাবে এতক্ষণ কথা বলেননি।

বাবা তার এই পরিবর্তনটা লক্ষ্য করেননি। আর ভদ্রমহিলা বাবার প্রায় কানে কানে জরুরি ভঙ্গিতে আর দ্রুত কি বললেন তা জানাতে খুব ইচ্ছে করছিল আমার।

বড়জোর দু’তিন মিনিট কথা বললেন ভদ্রমহিলা, তারপর মেয়ের কাছে এগিয়ে এলেন। হাঁটু গেড়ে বসে ফিসফিস করে মেয়ের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। মেয়েকে দ্রুত একটা চুমু খেয়ে গাড়িতে উঠলেন। গাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই ফুটম্যান লাফিয়ে গাড়িতে উঠল। ঘোড়সওয়াররা ঘোড়াকে তাড়া দিল, কোচোয়ান বাতাসে চাবুক হাঁকাল, ঘোড়াগুলোও নড়ে উঠল, একটু পর খুরের শব্দ উঠল, গাড়িটা পেছনে ঘোড়সওয়ার নিয়ে আবার আগের গতিতে ছুটতে শুরু করল।

-
এই গল্পের তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

thriller, literature, translation, english, series, 2, episode, story, carmilla