সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

bangabandhu-seikh-mujibur-rahman.jpg

প্রেক্ষিত: ভারত উপমহাদেশ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু কথা

অখন্ড ভারত বর্ষে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এবং অখন্ড পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে ক্যারিশম্যাটিক রাজনীতি মানুষ প্রত্যক্ষ্য করেছে, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীন বাংলাদেশে বর্তমানে সেই রকম দুরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে আমরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছি।

বর্ষ পরিক্রমার চিরাচরিত নিয়মেই বিশেষ বিশেষ দিবস গুলো নির্দিষ্ট সময়েই আমাদের সামনে এসে হাজির হয়। তেমনি একটি বিশেষ দিবস ১৫ আগষ্ট। আজ থেকে ৪০ বছর পূর্বে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট একটি বিয়োগান্তক ঘটনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে আমাদের মাঝ থেকে চিরতরে বিদায় নেন। যে ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের তৎকালীন রাজনীতির গতিপথের ও আমুল পরিবর্তন ঘটে।

গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্টই হচ্ছে, অধিক আলোচিত ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ত্ব বা বিষয়গুলো নিয়ে বেশীর ভাগ সময়েই অতি রাজনীতির প্রবনতা সৃষ্টি হয়। ফলে সেই সমস্ত বিষয়গুলো নিয়ে এতটাই আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষাপট তৈরী হয় যে, কখনও কখনও তা ভীষণভাবে স্পর্শ কাতরতার পর্যায় অতিক্রম করে যায়। সৃষ্টি হয় সংকীর্ণ রাজনীতির সুবিধা আদায়ের মোক্ষম উপলক্ষ্য। আলোচ্য বিষয় হয়ে যায় তখন বিকৃত ইতিহাসের একটি উর্বর ইস্যু। বাংলাদেশও তার বাইরে নয় বরং এখানকার পরিস্থিতি অনেক বেশী জটিল।

বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডল। কিন্তু সুবিধাবাদীদের দৌর্দন্ড প্রতাপে রাজনীতি যেমন হারিয়েছে তার সুনির্মল সৌন্দর্য ও জনপ্রিয়তা, তেমনি বঙ্গবন্ধুর মত ব্যক্তিত্ব কে নিয়েও শুরু হয়েছে বহুমূখী বিতর্ক! যা কখনও কারও কাছেই কাম্য ছিল না। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের অবশ্যই অপরিপক্ক, সুবিধাবাদী ও অমার্জিত রাজনীতিবিদদের খপ্পর থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করতে হবে। তবেই এদেশের রাজনীতি হবে পরিশুদ্ধ ও পরিশীলিত। আর কেবল তখনই বঙ্গবন্ধু ও জাতির অপরাপর শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব পাবেন সার্বজনীন সম্মান ও পরিপূর্ণ মর্যাদা। নইলে চলমান প্রবনতা আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব বিণাশের জন্যই হয়ে যেতে পারে একটা ভয়ঙ্কর আপদ!

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আলোচনা করার মত বিস্তৃত জ্ঞান আমার নেই। তবে তাঁর লেখা 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী', উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য সুত্র থেকে যতটুকু সঞ্চয় আমার আছে তা থেকেই যৎসামান্য আলোচনা করার প্রয়াস মাত্র। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তি চরিত নয় বরং তাঁর রাজনৈতিক জীবনই আমার আলোচ্য বিষয়। সে আলোকে বলতে গেলে, অসুস্থতা জনিত কারণে তাঁর চার বছরের পড়ালেখার বিরতি শেষে ১৯৩৭ সালে পূণরায় তিনি যখন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হন, তখন থেকেই তাঁর সমাজ সেবা মূলক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়েই রাজনীতির অপ্রাতিষ্ঠানিক সূচনা। তাঁর লেখা 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' থেকে জানা যায় যে, তাঁর শিক্ষক, আব্দুল হামিদ মাষ্টার এমএসসি সাহেবের সভাপতিত্বে 'মুসলিম সেবা সমিতি' নামে যে সমাজসেবা মূলক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছিল, তিনি ছিলেন তার সম্পাদক। যার কর্মসূচী ছিল দরিদ্র ছেলে মেয়েদের জন্য বই এবং পরীক্ষার আনুষঙ্গিক খরচ ও অন্যান্য খরচাদীর যোগান দেয়া। যা করতে গিয়ে অনেক সময় অনেক মুসলিম পরিবারের অসহযোগিতার সম্মুখীন ও হতে হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সেইসব পরিবারের সদস্যদের সাথে তাঁদের অসৌজন্যমূলক আচরণ স্বরূপ তাদের বাড়িতে ঠিল পর্যন্ত মারতে হয়েছে, আর সে কারণে বাবার কাছে বকুনীও খেতে হয়েছে ঢেড়। 

পাশাপাশি তিনি ফুটবল, ভলিবল ও হকি খেলাতেও পারদর্শী ছিলেন, ফলে স্থানীয় ভাবে তাঁর নেতৃত্বে বেশ একটা দলও গড়ে উঠেছিল। যে দলের সদস্যদের কেউ কিছু বললে তাদের কপালে জুটতো উত্তম-মধ্যম। এ ব্যাপারে কারও রক্ষে ছিল না। যদিও তখনও তাঁর মাঝে রাজনীতির প্রতি তেমন একটা ঝোঁক ছিল না, কিন্তু আঃ হামিদ মাষ্টারের মৃত্যুর পর থেকে নিজেই সংগঠনের দায়িত্ব পালন করার সাফল্যই তাঁকে সবার সামনে দক্ষ সংগঠকের মর্যাদায় মেলে ধরে।

১৯৩৮ সালের ঘটনা। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, কৃষক শ্রমিক পার্টি ছেড়ে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে তখন তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং হোসেন শহীদ সোহরোওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। দু’জনে একই সঙ্গে আসবেন গোপালগঞ্জে সভা করতে এবং এক্সিবিশন উদ্বোধন করতে। অথচ তখনও সেখানে মুসলিম লীগ বা ছাত্র সংগঠণের কোন কমিটিই গঠিত হয়নি। ফলে তাঁদের কর্মসূচী সফল করার জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠণ করা হলো একটা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। সকল কর্মসূচী সুচারুরূপে সম্পন্ন হওয়ায় বঙ্গবন্ধু শহীদ সাহেবের সুনজরে পড়ে যান এবং শহীদ সাহেব বঙ্গবন্ধুর নাম নোট করে কলকাতায় ফিরে যান।  

বলা চলে এভাবেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক  জীবনের সুত্রপাত। সেই স্কুল জীবনেই তাঁকে স্থানীয় হিন্দুসভার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে 'রমাপদ' কে ছোরা মারার মিথ্যা অভিযোগে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় এবং জামিন না পাওয়ায় ৭ দিন হাজত বাসও করতে হয়। এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম কারাভোগ।

১৯৩৯ সালে গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধুর চেষ্টাতেই গঠিত হয় 'মুসলিম ছাত্রলীগের' কমিটি, যার সভাপতি নির্বাচিত হন খন্দকার সামসুদ্দিন এবং সেক্রেটারী নির্বাচিত হন তিনি স্বয়ং। পাশাপাশি 'মুসলিম লীগ'র কমিটিও গঠিত হয় কিন্তু সেক্রেটারীর দায়-দায়িত্বও তাঁকেই পালন করতে হয়। সেই সঙ্গে 'মুসলিম লীগ ডিফেন্স কমিটি'র সেক্রেটারীও তিনিই নির্বাচিত হন। মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেনও তিনিই ছিলেন। এ ভাবেই শুরু হয় তাঁর সক্রিয় রাজনীতির অধ্যায়। সেই সাথে শুরু হয় শহীদ সাহেবের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ। যদিও তখন তাঁর বাবা আর বাধা দিতেন না তবে লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী হবার তাগিদ দিতেন।

১৯৪১ সালে তিনি যখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন, তখন তিনি কি ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তা তাঁর ভাষায়ই আমরা শুনি, 'তখন রাজনীতি শুরু করেছি ভীষণভাবে। সভা করি, বক্তৃতা করি। খেলার দিকে আর নজর নাই। শুধু মুসলিম লীগ আর ছাত্রলীগ। পাকিস্তান আনতেই হবে, নতুবা মুসলমানদের বাঁচার উপায় নাই। খবরের কাগজ আজাদ যা লেখে তাই সত্য বলে মনে হয়।' শুরু হলো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়। শহীদ সাহেবের স্নেহধন্য হয়ে ছুটে বেড়াতে লাগলেন তাঁরই নির্দেশে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল জুড়ে। রাজনীতির অসমতল পথ ধরে চড়াই-উৎরাই পাড় হয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন কাঙ্খিত লক্ষ্যে।

সাফল্যের পর সাফল্য আসতে থাকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে, যদিও তার জন্য অনেক ত্যাগও তাঁকে স্বীকার করতে হয়েছে। ১৯৪৯ সালের জুন মাসের ২৩-২৪ তারিখে ঢাকার রোজ গার্ডেনে এক কনভেনশনের আয়োজন করা হয়। শেখ সাহেব জেলে থাকায় নব নির্বাচিত এম এল এ শামসুল হক ছিলেন সেই কনভেনশনের মুল আয়োজক। সেখানে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শের এ বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকসহ প্রায় চারশ’ নেতা কর্মী উপস্থিত ছিলেন। সেই সভাতেই নতুন রাজনৈতিক দল 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' গঠন করা হয়। নতুন দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন যথাক্রমে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক এবং ইয়ার মোহাম্মদ খান। জেলে থেকেও বঙ্গবন্ধু যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। সেই কাউন্সিল অধিবেশনেও সভাপতিত্ব করেন মাওলানা ভাসানী। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তাজউদ্দিন আহমদ নিযুক্ত হন সাধারণ সম্পাদক হিসাবে। এরপরের ঘটনা তো বাংলাদেশে বহুল আলোচিত।

অখন্ড ভারত বর্ষে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এবং অখন্ড পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে ক্যারিশম্যাটিক রাজনীতি মানুষ প্রত্যক্ষ্য করেছে, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীন বাংলাদেশে বর্তমানে সেই রকম দুরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে আমরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছি।

আমরা আশা করব, বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের নেতারাই তাঁদের শেকড় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নতুন ইতিহাস বিনির্মাণে উদ্যোগী হয়ে দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষকে উন্নত ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ উপহার দিতে সফলকাম হবেন।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

অনুপ্রেরণা, শোক, ১৯৭৫, আগস্ট, ১৫, রাজনীতি, ১৯৭১, স্বাধীনতা, বাংলাদেশ, রহমান, মুজিবুর, বঙ্গবন্ধু