সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

Master-Da-Surjo-Sen.jpg

আমাদের মাস্টারদা; সূর্যসেন

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্যসেন আমাদের অহংকার। তাঁর জীবনী নিয়েই এই রচনা।

মাস্টারদা সূর্যসেনের কথা না বললে অপূর্ণই থেকে যায় ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংরামের গৌরবময় ইতিহাস। সূর্যসেনের জন্ম অবিভক্ত ভারতের চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ার নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। পিতা রাজমনি সেন ও মাতা শশীবালা।

আর দশজন বাঙ্গালীর মতই সূর্যসেন ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা। পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ পাশ করে চট্টগ্রামে ফিরে এসে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। কৃষ্ণনাথ কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি ঐ কলেজের অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী’র সান্নিধ্যে আসেন। সতীশ্চন্দ্র বিপ্লবীদল যুগান্তর এর সাথে যুক্ত ছিলেন। সূর্যসেনকে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষা দেন তিনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালে চট্টগ্রামের দেওয়াঞ্জী পুকুরপাড়ে সূর্যসেনের নেতৃত্বে অম্বিকা চক্রবর্তী, চারুবিকাশ দত্ত, তারকেশ্বর দস্তিদার, নগেন্দ্রচন্দ্র সেন ও জুলুসেন কর্তৃক গঠিত হয় বিপ্লবীদল সাম্যাস্রম। পরবর্তীতে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি’র বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানে অনুপ্রাণিত হয়ে দলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চট্টগ্রাম শাখা বা আইআরএ।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সমগ্র ভারতে বিশেষ করে চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছিলো বেশ কিছু বিপ্লবীদল। অন্যান্য দলগুলোর সাথে মূলনীতিগত দিক থেকে পার্থক্য না থাকলেও আইআরএ এর ছিল নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য। মাস্টারদা এই বিপ্লবী তরুণদের সামনে এমন কতোগুলো নৈতিক আদর্শ তুলে ধরেন যে বিপ্লবী যুবকেরা মাস্টারদা’র সেই আদর্শের আকর্ষণে সহজেই উদ্বুদ্ধ হল।

বিপ্লবী বলতে আমরা যদি বুঝে থাকি যে সুঠাম দেহের বলবান শারীরিক গঠনের কেউ তবে সেই তত্ত্ব মাস্টারদা’র বেলায় খাটে না। তিনি শারীরিক দিক থেকে দুর্বল ছিলেন উপরন্তু অস্ত্র চালনায়ও ছিলেন অপারদর্শী। অথচ লোকনাথ বল আর অনন্ত সিং এর মত সুঠাম ও বলবান শারীরিক গঠনের বিপ্লবী শিষ্যরা তাঁর নৈতিক ও মানসিক বলের কাছে মাথা নোয়াতেন। নির্দ্বিধায় প্রাণের ভয় তুচ্ছ করে করে তাঁর আদেশ পালন করতেন।

সেসময় বিপ্লবকার্যের অর্থসংগ্রহ করতে ডাকাতির পথ বেছে নিত বিপ্লবীদলগুলো। কিন্তু মাস্টারদা জনগণের কাছে নিজেদের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রক্ষার্থে বিকল্প পথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যদিও ১৯২৩ সালে তাঁর নির্দেশে অস্ত্র কেনার প্রয়োজনে এবি রেলের ১৭,০০০ টাকা ডাকাতি করেছিল তাঁর শিষ্যরা। তবে এরপরেই তিনি ভুল বুঝতে পেরে কোন অবস্থাতেই ডাকাতি না করার দৃঢ় সংকল্প করেন। ডাকাতি ছেড়ে দলের সভ্যদের নির্দেশ দেন নিজেদের ঘর থেকে অর্থ সংগ্রহ করে আনতে।

এতে অনুপ্রাণিত হয়ে বাবার লোহার সিন্দুক ভেঙে কয়েক হাজার টাকা এনে দিলেন অনন্ত সিং, জমিদারপুত্র শ্রীপতি চৌধুরী বাবার ব্যবসার টাকা এনে মাস্টারদা’র হাতে তুলেন দিলেন। এমনকি দরিদ্রতম বিপ্লবী ধীরেন দে মা’র রুপোর গহনা এনে দেয় দেশের কাজে। মাস্টারদা’র এই একটি সিদ্ধান্তেই একদিকে যেমন দলের সভ্যদের সংহতি বৃদ্ধি করে তেমনি সাধারণের মাঝে দলের মর্যাদা বেড়ে যায়।

মাস্টারদা বিশ্বাস করতেন নির্ভীক কর্তব্যপরায়নতার সঙ্গে কোমল হৃদয়ের মেলবন্ধন যুবক সমাজকে প্রভাবিত করা যায় না। এই মনোভাবের সার্থকতার ফলেই তিনি সর্বসাধারণের ভালবাসা সম্মানে মাস্টারদা হয়ে উঠেন যে সম্মান খুব কম বিপ্লবীরই ভাগ্যে জোটে।

অনেক বিপ্লবীদল নির্বিচার মানুষ হত্যার মধ্য দিয়ে লক্ষ্যবিচ্যূত হয়ে সন্ত্রাসীদলে পরিণত হয়। কিন্তু সূর্যসেন ছিলেন অত্যন্ত সাবধানী বিবেচক। শিষ্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দেশের মুক্তির জন্যই আজ আমরা হত্যাকারী সেজেছি। আমাদের চেয়ে মানুষকে বেশি ভালোবাসে কে? নিজেদের বিবেককে সহস্রবার প্রশ্ন করবে কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন মাস্টারদা’র জীবনের সবচে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে সুসজ্জিত ব্রিটিশসেনাদের বিরুদ্ধে জয়ী হতে অত্যাধুনিক অস্ত্র খুবই জরুরী। আর তাই দলীয় কাউন্সিলের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর নির্দেশে পাহাড়তলির অস্ত্রাগারে অতর্কিত হামলা চালায় ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি। এতে দিশেহার হয়ে পড়ে ব্রিটিশ সেনারা। প্রয়োজনীয় অস্ত্রস্বস্ত্র লুঠ করে নেয় তাঁরা। টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস দখল করে নেওয়ার পর পরিকল্পনা অনুযায়ী সর্বশেষে বিপ্লবীরা দামপাড়ার পুলিশ রিজার্ভ দখল করে নেয়। এরপর সেখানে সমবেত হয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

সূর্যসেন অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ভারতের জাতীয় পতাকা এখন আকাশে উড়ছে। আমাদের কর্তব্য নিজেদের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে এটিকে রক্ষা করা

উল্লেখ্য, এ সময় চট্টগ্রাম চারদিন ব্রিটিশ শাসন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। এরপর জালালাবাদ হত্যাযজ্ঞের প্রতিশোধ নিতে মাস্টারদা পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। এই ক্লাবটিতে ব্রিটিশ সাহেব ও মেমরা আমোদফুর্তি করতেন। ক্লাবটি কুখ্যাত ছিল ভারতীয়দের কাছে। কেননা এর প্রবেশপথে লেখা ছিল কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ

মাস্টারদা এই অভিযানের দায়িত্ব দেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে। তাঁর নেতৃত্বে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির অভ্যুত্থানকে স্মরণ করে ১৮ এপ্রিল রাতে ক্লাবে আক্রমণ চালান হয়। এতে পুরো ক্লাব তছনছ করতে সফল হয় বিপ্লবীরা এবং ৫ জন ব্রিটিশ সভ্য মারা যান, বাকিরা মারাত্মকভাবে আহত হয়।

এরপর একে একে সব বিপ্লবীরা চলে গেলেও পটাশিয়াম সাইনাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম এ নারী শহীদ। তাঁর গায়ে একটি চিঠি পাওয়া যায় যাতে লেখা ছিল, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে আমি খুশি মনে জীবন বিসর্জন দিলাম। বলাই বাহুল্য তিনি এ মহৎ কর্মে মাস্টারদা’র সম্মতি পেয়েছিলেন।

ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমনের এর ঘটনার পর ব্রিটিশ শাসকেরা সূর্যসেনকে ধরতে মরিয়া হয়ে উঠে। তাকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দিতে ১০,০০০ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এই অবস্থায় মাস্টারদা আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে তাঁরই স্নেহশীল আত্মীয় নেত্রসেন অর্থলোভে পড়ে তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। ১৯৩৩ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি নেত্রসেনের ঘর থেকে গ্রেফতার করা হয় মাস্টারদা কে।

নেত্রসেনের এই বিশ্বাসঘাতকতায় বিপ্লবীদলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এমনকি তার স্ত্রী স্বামীর উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। দুইজন মাস্টারদাপ্রেমী বিপ্লবী নেত্রসেনকে হত্যা করে তার স্ত্রীর সহায়তায়। রাতে খাবারের সময় নেত্রের স্ত্রী অন্যরুমে গেলে দুইজন বিপ্লবী অতর্কিতভাবে এসে তার শিরচ্ছেদ করে চলে যায়। পরে স্বামীর হত্যাকারীদের দেখেছেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি পুলিশকে বলেন, আমি দেখেছি কিন্তু আমার বিবেক নিষেধ করছে আমাকে । যারা এ কাজ করেছে আমি মনে করি তারা পবিত্র দায়িত্ব পালন করেছে

এদিকে সূর্যসেন, তারাকেশ্বর দস্তিদার ও কল্পনা দত্তের বিচার চলে ট্রাইব্যুনালে। মাস্টারদা ও তারাকেশ্বরকে মৃত্যুদণ্ড এবং কল্পনাকে দ্বীপান্তর যাবজ্জীবন সাজা দেয়। ১২ জানুয়ারি ১৯৩৪ এর গভীর রাতে তাঁদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। ব্রিটিশ সরকার তাদের লাশ আত্মীয়দের কাছে দেয় নি। এমনকি সৎকার না করে বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দেয়।

মাস্টারদা ১১ জানুয়ারি জীবনের শেষ রাতে তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশ্যে এক চিঠিতে লিখেন, আমার বিদায় বাণী-আদর্শ ও একতা। আজ এই আনন্দময়, পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ দিনে আমি তোমাদের জন্য কি রেখে গেলাম? কেবল আমার স্বপ্ন, একটি সোনালি স্বপ্ন স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। প্রিয় বিপ্লবী বন্ধুরা, এগিয়ে চলো কখনও পিছিয়ে যেও না। দাসত্বের শৃংখল ভাঙার সময় চলে এসেছে। বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত

ভারতের স্বাধীনতায় সূর্যসেন এক মহানায়ক। কেননা অনেক মাস্টারমশাই বিপ্লবী নেতা হয়েছিলেন কিন্তু মাস্টারদা হতে পেড়েছেন কেবল তিনিই।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

মাস্টারদা, সূর্যসেন, ব্রিটিশবিরোধী, আন্দোলন, বিপ্লবী, প্রীতিলতা-ওয়াদ্দেদার