সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

africa.jpg

মোহাম্মদ দি ম্যাসেঞ্জার অব গড দেখে এলাম বিশ্বনবী (সা.) কে নিয়ে ইরানের নির্মিত সিনেমা

বিশ্বনবী (সা.)’র ওপর নির্মিত ছায়াছবির প্রদর্শন শুরু হয়েছে ইরানে। ছায়াছবিটি আমি সহ হাজারো দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপভোগ করেছে। ভারত, ইতালি ও আমেরিকার বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় মিউজিক ও ছবির দৃশ্যের নিপুণ কারুকাজ এতটাই অসাধারণ ছিল যে এক কথায় তা না দেখলে বোঝানো যাবে না। তারপরও চেষ্টা করেছি তুলে ধরার।

বহু প্রতীক্ষার পর দেখে এলাম ইরানে বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)’র জীবন কাহিনীর ওপর নির্মিত মোহাম্মদ দি ম্যাসেঞ্জার অব গড ছায়াছবি। ২৬শে আগস্ট মুক্তি পাওয়ার প্রথম দিনেই হলে গিয়ে সপরিবারে ছায়াছবিটি দেখলাম। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার অনেক আগে থেকেই একটি মহল এর সমালোচনা করে আসছিল। এ জন্য আরো গভীর আগ্রহের সঙ্গে ছবিটি দেখেছি। কিন্তু সমালোচনার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল পেলাম না।

বিশ্বনবীর ওপর নির্মিত এ সিনেমাটি এক কথায় অসাধারণ। আমার জীবনে দেখা এটিই হবে সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র। তিন ঘণ্টার এ ছবিটি যখন দেখি বাইরের কোনো চিন্তাই যেন আমি মনে করতে পারিনি। এক দৃষ্টিতে ছায়াছবিটি দেখে আমি এতটাই মুগ্ধ হয়েছি যে মনে হয়েছিল আমি তৎকালীন আরব সমাজে তথা রসুলের যুগেই বসবাস করছি। সিনেমা দেখা শেষ হওয়ার পর অতৃপ্তই রয়ে গেছি। কারণ আমার প্রয়োজন ছিল এক গ্লাস পানির। কিন্তু তিন ভাগের একভাগ পানি খেয়ে কি পিপাসা মিটবে? না কখনই সে পিপাসা মিটবে না। এ ছবির ক্ষেত্রে ঠিক তাই হয়েছে। কারণ এ ছায়াছবিটি মোট তিন খণ্ডের এবং এটা ছিল প্রথম খণ্ড। পরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড ছবি নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে।

বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)’র জীবনীর ওপর নির্মিত প্রথম খণ্ডের এ ছবিটির কাহিনী শুরু হয়েছে বিশ্বনবীর জন্মের প্রায় ৫০ দিন আগে সংঘটিত ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহার হাজার হাজার সৈন্যসহ বিশাল হস্তি বাহিনীর মক্কা দখলের অভিযান দিয়ে। আল্লাহর নির্দেশে আবাবিল পাখির হামলায় দাম্ভিক আবরাহার বিশাল সেনাবাহিনী কিভাবে ধ্বংস হল সে চিত্র উঠে এসেছে এই ছায়াছবিতে।

এর পর রসুলের জন্মের আগে আইয়ামে জাহিলিয়াত যুগে সাধারণ মানুষের ওপর তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতনসহ সে সময়কার সমাজ ব্যবস্থার অনেক চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রসুলের জন্মের সময় প্রকৃতিতে আশ্চর্যজনকভাবে একটা পরিবর্তন আসে সেটাও ছায়াছবিতে আনা হয়েছে। জন্মের সময়কার কিছু অলৌকিক ঘটনা, মোহাম্মদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের চক্রান্ত, শিশুদের বলিদান, দাসপ্রথা, দুধমাতা হালিমার কাছে শিশু মুহাম্মদকে হস্তান্তর ও এ ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশে উটের ভূমিকা, আবার মা আমিনার কাছে ফিরে আসা, আমিনার মৃত্যু, আবদুল মোত্তালিবের মৃত্যু এবং রসুলের শৈশবের কিছু মুজিজা তুলে ধরা হয়েছে।

এ ছাড়া, কিভাবে ও কেন কন্যা শিশুকে জীবন্ত মাটিতে পুতে হত্যা করা হত এবং এ ব্যাপারে রসুলের ভূমিকা কি ছিল তা উঠে এসেছে। সিনেমার শেষাংশে আবারো শোয়াবে আবু তালিবের ঘটনা দেখানো হয়েছে যেখানে দেখা যায়, মক্কার কুরাইশরা বনু হাশিম গোত্রের সঙ্গে যে নির্যাতনমূলক চুক্তি করেছিল সেই চুক্তির দলিল পোকায় খেয়ে ফেলে। ফলে চুক্তি বাতিল হয়ে যায় এবং নির্বাসিতন মুসলমানরা মুক্তি পায়।

শিশু ও কিশোর বয়সে তিনি যেখানেই যেতেন সেখানেই রহমত বর্ষিত হত। তার সামান্য ছোঁয়া পাওয়ার জন্য মানুষ ব্যাকুল হয়ে থাকতো, তার দিকে চেয়ে থাকাটাও ছিল মানুষের জন্য এক ধরণের প্রশান্তি-দায়ক। এভাবে বিশ্বনবী (সা.)’র মাত্র ১২ বছর বয়স পর্যন্ত ঘটনাবলীর নানা কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ চলচ্চিত্রে। ছবিটিতে সে সময় মানুষের ব্যবহৃত পোশাক, ঘরবাড়ির ধরণ, রাস্তাঘাট, অলিগলি ও ঘরে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। পুরো ছবিতে নায়ক (বিশ্বনবী)’র দুর্দান্ত উপস্থিতি রয়েছে এবং তার ডায়ালগ ছিল। তবে ক্যামেরা ধরা হয়েছে পেছন থেকে। শুধুমাত্র তাঁর হাতে কব্জি, আঙ্গুল ও পায়ের পাতা দেখানো হয়েছে। তাঁর অবয়ব দেখা গেছে কিন্তু তাঁর চেহারা মোবারক দেখানো হয়নি।

এমনকি ছায়াছবির চরিত্রে যারা অভিনয় করেছেন তাদের প্রত্যেকের নাম দেখানো হলেও বিশ্বনবীর চরিত্রে যে ছেলেটি অভিনয় করেছে তার নামও ওই অভিনয়কারীদের তালিকায় রাখা হয়নি। তবে, মুভিতে আবদুল মোত্তালিব, আবু তালিব, রসুলের মা আমিনা, দুধমাতা হালিমা, আবু সুফিয়ান, আবু লাহাবসহ তৎকালীন নেতৃবৃন্দের চরিত্রে অভিনয়কারীদের দেখানো হয়েছে। মুভিটি শেষ হয়েছে একটি নাতে রসুল দিয়ে।

ছায়াছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে ওঠা মিউজিক ছিল মন পাগল করার মতো। মন পাগল করা মিউজিক ও ছবির দৃশ্য পাগলের মতো উপভোগ করেছে হাজার হাজার দর্শক। মানুষকে নিয়ে গেছে সেই ১৪০০ বছর আগের যুগে। সব মিলিয়ে অসাধারণ লেগেছে এ ছবি। 

বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) যে সত্যিই সারা বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ এবং তিনি ছিলেন অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী তাও ছবিটির প্রতিটি পরতে পরতে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহীভাবে তুলে ধরেছেন চলচ্চিত্রের পরিচালক মাজিদ মাজিদি। মাজিদ মাজিদি বলেছেন, মুহাম্মদ (সা.)’র মুভিটি পবিত্র ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ভ্রান্ত ধারণা দূর করবে বলে আশা করি। পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম সম্পর্কে এমনসব ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যার সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। শুরুতেই যারা এ ছবির সমালোচনা করেছেন তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের মতো হাতেগোনা কয়েকটি দেশে এ চলচ্চিত্র নিয়ে সমস্যা থাকতেই পারে। কিন্তু তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশ এ ছবির বিষয়ে প্রচণ্ড আগ্রহ দেখিয়েছে।

যাইহোক, যে মহলটি বিশ্বনবীকে নিয়ে নির্মিত এই ছবির বিরোধিতা করেছিল এবং সমালোচনায় লিপ্ত ছিল ছবিটি প্রকাশিত হওয়ার পর তাদের সে সমালোচনা কিংবা বিরোধিতার আর কোনো যৌক্তিকতা থাকল না। 

এই ছিল বিশ্বনবী হযরত মোঃ (সা.)’র জীবন কাহিনীর ওপর নির্মিত ছায়াছবি দেখার অভিজ্ঞতা। পরবর্তী আরো দুই খণ্ড ছায়াছবি দেখার অপেক্ষায় রইলাম। #


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

মোহাম্মদ-দি-ম্যাসেঞ্জার-অব-গড, ইরান, সিনেমা, মুভি, মোহাম্মদ-(সা:), বিশ্বনবী, আইয়ামে-জাহিলিয়াত, জীবনী, মাজিদ-মাজিদি, ছায়াছবি, সমালোচনা